আইএমএফ প্রতিনিধি দল ঢাকায় আসছে আজ

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ কার্যক্রমের আওতায় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়নের মূল্যায়ন করতে সংস্থাটির একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল আজ শনিবার (৫ এপ্রিল) ঢাকায় এসে পৌঁছাচ্ছে। সফরের মূল লক্ষ্য হচ্ছে, চার দশমিক সাত বিলিয়ন ডলারের ঋণের চতুর্থ ও পঞ্চম কিস্তি ছাড়ের আগে নির্ধারিত সংস্কার কর্মসূচির অগ্রগতি পর্যালোচনা করা।
আইএমএফ মিশনের গুরুত্ব ও প্রেক্ষাপট
২০২২ সালের শেষ প্রান্তিকে আইএমএফ বাংলাদেশকে ৪.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ অনুমোদন করে, যা তিন বছর মেয়াদি একটি প্রোগ্রামের অংশ। এ ঋণ কার্যক্রমের মাধ্যমে সরকার রাজস্ব আহরণ, বাজেট ঘাটতি হ্রাস, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে মূল্য সংযোজন এবং আর্থিক খাতের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ করতেই আইএমএফের এই সফর।
সূত্র জানায়, এবারের সফরে আইএমএফ প্রতিনিধি দল কেবলমাত্র অর্থনৈতিক নীতিমালা নয়, বরং এর কার্যকর প্রয়োগ এবং কাঠামোগত সংস্কারের বাস্তব অবস্থা নিয়েও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করবে। বিশেষ করে, রাজস্ব নীতির সংস্কার, ভর্তুকি কমানো, জ্বালানি খাতের মূল্য বাস্তবায়ন ও আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা বৃদ্ধির বিষয়গুলো এবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে।
প্রতিনিধি দলের সূচি ও বৈঠক পরিকল্পনা
অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, প্রতিনিধি দলটি আগামীকাল রোববার (৬ এপ্রিল) থেকে দুই সপ্তাহ ঢাকায় অবস্থান করবে এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থার সঙ্গে বৈঠক করবে। সফরের শুরুতেই অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এই বৈঠকে সরকারের চলমান অর্থনৈতিক নীতিমালা, বাজেট বাস্তবায়ন অগ্রগতি এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।
এরপর পর্যায়ক্রমে আইএমএফ কর্মকর্তারা অর্থ বিভাগ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), বিদ্যুৎ বিভাগ, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি), বাংলাদেশ জ্বালানি নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিইআরসি), এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের প্রতিনিধিদের সঙ্গে পৃথক পৃথক বৈঠক করবেন। প্রতিটি সংস্থার কাছে আইএমএফ তাদের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী অগ্রগতির আপডেট চাইবে এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার নির্যাস সংগ্রহ করবে।
সংস্কার কার্যক্রমের অগ্রগতি ও চ্যালেঞ্জ
গত এক বছরে বাংলাদেশ সরকার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত সংস্কার হাতে নিয়েছে। রাজস্ব নীতিতে ডিজিটাল ভ্যাট আদায়, আয়কর নীতিমালার হালনাগাদ এবং স্বচ্ছতা বৃদ্ধির জন্য স্বয়ংক্রিয় তথ্য ব্যবস্থাপনা চালু হয়েছে। একইসঙ্গে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে পর্যায়ক্রমে ভর্তুকি কমানোর পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে। তবে এই সংস্কার কার্যক্রমের বাস্তবায়নে এখনো কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সংস্কার বাস্তবায়ন একটি সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া। রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলেও প্রশাসনিক জটিলতা, জনসচেতনতার অভাব এবং কিছু ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা সংস্কার কাজে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। আইএমএফ এসব দিকগুলোও গভীরভাবে পর্যালোচনা করে পরবর্তী কিস্তি ছাড়ের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।
আইএমএফের শর্তাবলি ও সরকারপ্রধানের অবস্থান
আইএমএফের ঋণ শর্তাবলির মধ্যে অন্যতম হচ্ছে জ্বালানি খাতে সাবসিডি হ্রাস, ব্যাংক খাতে অনিয়ম দূর করা, এবং ভোক্তা পর্যায়ে জ্বালানি ও বিদ্যুতের প্রকৃত মূল্যে হালনাগাদ। যদিও সরকার ইতোমধ্যে কিছু ক্ষেত্রে মূল্য বৃদ্ধি করেছে, তবুও এই পদক্ষেপ যথেষ্ট কি না, তা নিয়েই এবার আলোচনা হবে।
সরকারের পক্ষ থেকে ইতিবাচক ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, উন্নয়ন সহযোগীদের আস্থা অর্জনে সরকার প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত রাখবে। অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, “আইএমএফের সঙ্গে আমাদের সুসম্পর্ক রয়েছে এবং আমরা আমাদের প্রতিশ্রুত সংস্কার বাস্তবায়নে আন্তরিক।”
সফরের শেষ এবং সম্ভাব্য ঘোষণা
সফরের শেষ দিনে, অর্থাৎ ১৭ এপ্রিল, আইএমএফ প্রতিনিধি দল অর্থ উপদেষ্টা সালেহ উদ্দিন আহমেদের সঙ্গে চূড়ান্ত বৈঠক করবে। বৈঠক শেষে একটি যৌথ সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে সফরের সারাংশ, অর্জন এবং পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে গণমাধ্যমকে অবহিত করা হবে।
এই সংবাদ সম্মেলনে প্রতিনিধি দল চতুর্থ ও পঞ্চম কিস্তির ছাড়ের বিষয়ে তাদের মতামত প্রকাশ করতে পারে। যদিও আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত আইএমএফ বোর্ড সভায় অনুমোদনের পরই ঘোষণা করা হবে, তবুও সফরের মূল্যায়ন ইতিবাচক হলে তহবিল ছাড়ের সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যাবে।
উপসংহার
আইএমএফ প্রতিনিধি দলের এই সফর বাংলাদেশের জন্য অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি কেবলমাত্র ঋণের কিস্তি ছাড়ের বিষয় নয়, বরং সরকারের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার উপর আন্তর্জাতিক আস্থার প্রতিফলন ঘটাবে। যদি এই সফর সফল হয়, তবে তা বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে স্বস্তি এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় ভূমিকা রাখবে।
সরকারের উচিত হবে এই সফরের প্রতিটি বৈঠককে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করা এবং যেসব সংস্কার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, সেগুলো দ্রুত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা দেওয়া। এতে কেবল আইএমএফ নয়, অন্যান্য আন্তর্জাতিক সহযোগীরাও বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রতি আস্থা রাখবে।