গ্রাস ম্যাট রপ্তানি শুরু করল আরএফএল

বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী আরএফএল (রংপুর ফাউন্ড্রি লিমিটেড) দেশের গণ্ডি পেরিয়ে এবার আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন এক সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে। প্রতিষ্ঠানটি প্রথমবারের মতো তাদের নিজস্ব উৎপাদিত গ্রাস ম্যাট (Grass Mat) ফিলিপাইনে রপ্তানি করেছে। এই রপ্তানি কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশি শিল্পপণ্যের বহির্বিশ্বে গ্রহণযোগ্যতা আরও একধাপ এগিয়ে গেল।
রপ্তানির সূচনা ও উৎপাদন কেন্দ্র
গ্রাস ম্যাট পণ্যটি আরএফএলের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান আরএফএল প্লাস্টিকস লিমিটেড উৎপাদন করছে। নরসিংদীর ডাঙ্গা ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে অবস্থিত কারখানায় ‘সাপোর্ট’ (Support) ব্র্যান্ডের অধীনে এই পণ্য উৎপাদন করা হচ্ছে। এখান থেকেই ফিলিপাইনের উদ্দেশে প্রথম চালান পাঠানো হয়েছে বলে জানায় প্রতিষ্ঠানটি।
আজ শনিবার আরএফএলের পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ফিলিপাইনে রপ্তানির মাধ্যমে কোম্পানিটি আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করেছে। এটি শুধু আরএফএলের জন্যই নয়, বরং দেশের উৎপাদনশীল শিল্প খাতের জন্য একটি ইতিবাচক দিকচিহ্ন।
গ্রাস ম্যাট: ব্যবহার ও বাজার
গ্রাস ম্যাট মূলত কৃত্রিম ঘাস দিয়ে তৈরি এমন একধরনের পণ্য, যা ভবনের অভ্যন্তরীণ ও বাইরের সৌন্দর্য বৃদ্ধির পাশাপাশি খেলার মাঠ, ল্যান্ডস্কেপ ডিজাইন, পার্ক ও বিনোদন কেন্দ্র ইত্যাদি জায়গায় ব্যবহার করা হয়। এ ধরনের পণ্য আগে বিদেশ থেকে আমদানি করে দেশের চাহিদা পূরণ করা হতো। এখন দেশে উৎপাদিত গ্রাস ম্যাটই সেই চাহিদা মেটাতে সক্ষম হচ্ছে।
কর্মকর্তাদের বক্তব্য
আরএফএল প্লাস্টিকস লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন,
“আগে এই পণ্য বিদেশ থেকে আমদানি করতে হতো। এখন আমরা নিজস্ব উৎপাদন দ্বারা দেশে চাহিদা মেটাতে পারছি। এতে করে আমদানিনির্ভরতা হ্রাস পাচ্ছে এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, গ্রাস ম্যাট উৎপাদন ও রপ্তানি দেশের শিল্প খাতে একটি নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে। এটি শুধু একটি পণ্যের বাণিজ্য নয়, বরং আত্মনির্ভরতার প্রতীক।
আরএফএল প্লাস্টিকসের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (সিওও) আহসান হাবিব বলেন,
“প্রথমবারের মতো সাপোর্ট ব্র্যান্ডের গ্রাস ম্যাট রপ্তানি করতে পেরে আমরা আনন্দিত। আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের পণ্যের গুণগত মান ও উৎপাদন সক্ষমতা স্বীকৃতি পেয়েছে। এটি আমাদের জন্য একটি বড় অর্জন।”
তিনি যোগ করেন,
“আমরা এখন শুধু দেশীয় বাজারেই সীমাবদ্ধ নই; বিদেশেও আমাদের অবস্থান সুদৃঢ় করতে চাই। ইতোমধ্যেই ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বাজার নিয়ে কাজ শুরু হয়েছে।”
বৈশ্বিক বাজারে সম্ভাবনা
বিশ্ববাজারে গ্রাস ম্যাটের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। বিশেষ করে আবাসন প্রকল্প, অফিস, খেলাধুলার অবকাঠামো এবং পার্ক উন্নয়নে এই পণ্যের ব্যবহার বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। আরএফএলের কর্মকর্তারা মনে করছেন, সঠিক মার্কেটিং ও রপ্তানি নীতির মাধ্যমে বাংলাদেশ এই বাজারে স্থায়ীভাবে জায়গা করে নিতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিবেশবান্ধব ও টেকসই এই পণ্যটির আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ বাংলাদেশের প্লাস্টিক ও হালকা প্রকৌশল খাতকে বৈচিত্র্যময় করে তুলবে।
উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
রপ্তানি বাজারে প্রবেশের পর আরএফএল নতুন করে তাদের উৎপাদন অবকাঠামো সম্প্রসারণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, আগামী এক বছরের মধ্যে উৎপাদন ক্ষমতা দ্বিগুণ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকাসহ অন্যান্য সম্ভাবনাময় বাজারে রপ্তানি কার্যক্রম আরও সম্প্রসারিত করা যায়।
আরএফএল গ্রুপের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন,
“আমরা শুধু এক বা দুইটি চালানে সীমাবদ্ধ থাকতে চাই না। বরং এই পণ্যে দীর্ঘমেয়াদি রপ্তানি সম্ভাবনা রয়েছে। তাই, আমাদের কারখানায় আধুনিক প্রযুক্তি সংযোজন ও দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার দিকেও আমরা মনোযোগী।”
জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান
গ্রাস ম্যাটের মতো নন-ট্র্যাডিশনাল বা অপ্রচলিত পণ্যের রপ্তানি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বহুমুখী প্রভাব ফেলতে পারে। এটি যেমন বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ তৈরি করবে, তেমনি দেশের কর্মসংস্থান ও প্রযুক্তি খাতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।
বিশেষ করে দেশের প্লাস্টিক ও রাবার পণ্যের শিল্পে বৈচিত্র্য ও উদ্ভাবনের যে প্রয়োজন, এই উদ্যোগ সেটি পূরণে সহায়ক হবে বলে অর্থনীতিবিদরা মত দিয়েছেন।
সমাপ্তি কথা
আরএফএলের গ্রাস ম্যাট রপ্তানি কার্যক্রম নিঃসন্দেহে একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। দেশের শিল্প খাত যখন বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় নিজেকে তুলে ধরতে চায়, তখন এই ধরনের উদ্যোগ সেই লক্ষ্যে কার্যকর ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশের তৈরি শিল্পপণ্য শুধু দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না—এই বিশ্বাসকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার এক অনন্য প্রয়াস এই রপ্তানি কার্যক্রম।
সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের রপ্তানিনির্ভর শিল্প উন্নয়ন নীতি ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ এমন কার্যক্রমে গতি এনেছে। তবে এই সফলতা ধরে রাখতে হলে পণ্যের গুণগত মান, সময়মতো সরবরাহ এবং বাজার বিশ্লেষণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।
বিশ্বব্যাপী পরিবেশবান্ধব ও সাস্টেইনেবল পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে গ্রাস ম্যাটসহ আরও কিছু সম্ভাবনাময় পণ্য নিয়ে আরএফএল ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান এগিয়ে এলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ বহুজাতিক প্লাস্টিক পণ্যের রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে।