রাজনীতি

ক্ষমতায় না গিয়েও অনেকে ক্ষমতার দাপট দেখাচ্ছেন: শফিকুর রহমান

Advertisement

জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের আমির, ডা. শফিকুর রহমান সম্প্রতি খুলনা মহানগরীর শিববাড়ী বাবরী চত্বরে অনুষ্ঠিত ৮ দলের বিভাগীয় সমাবেশে ভাষণ দিয়ে বলেছেন, “ক্ষমতায় না গিয়েও অনেকে ক্ষমতার দাপট দেখাচ্ছেন, প্রশাসনিক ক্যু করার চেষ্টা করছেন।” তিনি সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড এবং রাজনৈতিক দুর্নীতি নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছেন।

শফিকুর রহমান বলেন, “কোনো দেশপ্রেমিক দল চাঁদাবাজি করে ৫ আগস্টের পর আবির্ভূত হয়নি। যারা আবির্ভূত হয়েছে, তাদের সঙ্গে আমরা বসেছিলাম দায় ও দরদ নিয়ে। এটি শহীদদের রক্তের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা, যা বন্ধ করতে হবে। যদি বন্ধ করা না হয়, তবে বিপ্লবী জনগণ, তরুণরা, এবং কোলে বাচ্চা নিয়ে রাস্তায় নেমে আসা মা-মহিলারা আমাদের ক্ষমা করবেন না।”

তিনি আরও বলেন, “চাঁদাবাজি এবং দুর্নীতি অব্যাহত রয়েছে। ক্ষমতায় না গিয়েও অনেকে নিজেদের দাপট দেখাচ্ছেন এবং প্রশাসনিক ক্যু করার চেষ্টা করছেন। আগামী নির্বাচনে কিছুজন ছলচাতুরি ও ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করতে চাইছে। তবে জনগণ যেভাবেই ভোট দিক, আমাদেরকে ক্ষমতায় যেতে হবে। বন্ধুগণ, বেলা শেষ, দিনও শেষ, সূর্যও ডুবে গেছে। এই বাংলাদেশে এটি আর হবে না, আমরা এটি হতে দেব না, ইনশাআল্লাহ।”

সমাবেশের সভাপতিত্ব করেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির ও চরমোনাই পীর, মুফতি সৈয়দ মো. রেজাউল করীম। এতে বিভিন্ন রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

৫ আগস্টের বিপ্লব ও বর্তমান পরিস্থিতি

শফিকুর রহমান সমাবেশে বলেন, “দিশাহারা বা হতাশ হয়ে কেউ চোরা গলিতে হাটার চেষ্টা করলে, আমরা প্রয়োজনে আরেকটি ৫ আগস্টের বিপ্লব সংঘটিত করব। সেই ৫ আগস্ট সন্ত্রাস ও ফ্যাসিবাদকে তাড়িয়ে দিয়েছিল, এবারও রুখে দেব ইনশাআল্লাহ।”

তিনি দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দুর্নীতি নিয়ে তীব্রভাবে বক্তব্য রাখেন। বলেন, “কিছু দল ও ব্যক্তি বাংলাদেশকে দফায় দফায় দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন করেছে এবং বিশ্বের দরবারে অপমানিত করেছে। এদের সকলের অতীত রেকর্ড জনগণের হাতে আছে। ৫ আগস্টের বিপ্লবের পর থেকে একটি গোষ্ঠী জনগণের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। আজ চাঁদাবাজদের দৌরাত্ন্যে সমাজ জীবনের সর্বত্র ত্রাহি-ত্রাহি অবস্থা, বিনিয়োগকারী, শিল্পপতি, ব্যবসায়ী কেউই নিরাপদ নয়। চাঁদাবাজি আগের চেয়ে বেড়েছে, ফলে সবাই বিষাক্ত নিশ্বাস ফেলে বলছে, ‘আগেও ভালো ছিলাম না, এখন আরও খারাপ।’”

তিনি আরও যোগ করেন, “৫ আগস্টের পর আল্লাহ আমাদের এ দেশে বাঁচিয়ে রেখেছেন এবং মুক্তির স্বাদ দিয়েছেন। কিন্তু কোনো ইসলামী দলের নামে চাঁদাবাজি করার সুযোগ কাউকে দেওয়া হয়নি।”

জনগণ ও যুবক-যুবতীদের প্রতি আহ্বান

জামায়াতের আমির বলেন, “এখন থেকে ছাত্র-জনতা, শ্রমিক-জনতা, ব্যবসায়ী, শিশু থেকে বৃদ্ধ সকলের ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। এই ঐক্যই আগামীতে জাতীয় সংসদে বিজয়ী হবে। এ বিজয় কেউ ঠেকাতে পারবে না। আমরা মজলুমের পক্ষে, অপশাসনের বিরুদ্ধে, বৈষম্যের বিরুদ্ধে, ন্যায়ের পক্ষে আছি। আল্লাহর কুরআনের বিধানের পক্ষে আছি। এই বিজয় আমাদের হবে, ইনশাআল্লাহ।”

তিনি যুবকদের উদ্দেশ্যে বলেন, “যারা বয়সে ৩৫-এর নিচে, তারা তিনটি নির্বাচনে ভোট দিতে পারে নি। আগামীতে তোমাদের ভোট নিয়ে কেউ খেলবে, চুরি করবে, হাইজ্যাক করবে—তুমি তা কি সহ্য করবে? আমরা তোমাদের ভোটের পাহারাদারি করব, যুবক হিসেবে তোমাদের সঙ্গে লড়ব।”

দুর্নীতিমুক্ত ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি

শফিকুর রহমান বলেন, “আমরা জনগণের জন্য দুর্নীতিমুক্ত সমাজ, ন্যায়বিচার এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করতে অঙ্গীকারবদ্ধ। স্বাধীন রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চলবে। যুবকদের আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চলবে। আমরা বাংলাদেশ তোমাদের হাতে তুলে দিতে চাই।”

তিনি দেশের ইতিহাসের সংবিধান ও ফ্যাসিবাদ নিয়ে সতর্ক করেন। বলেন, “কেউ ৭২ সালের সংবিধান নিয়ে আলোচনা করলে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করছে। যারা জিয়াউর রহমান এবং বেগম খালেদা জিয়াকে শ্রদ্ধা করে, তারা ভুলেও ৭২ সালের ফ্যাসিবাদী সংবিধানের কথা বলবেন না।”

সমাবেশে উপস্থিত বিশিষ্ট অতিথি ও নেতৃবৃন্দ

সমাবেশে বিশেষ অতিথি ছিলেন:

  • মাওলানা মামুনুল হক, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির
  • মাওলানা সাখাওয়াত হোসাইন, খেলাফত মজলিসের সিনিয়র নায়েবে আমির
  • মুফতি মুসা বিন ইজহার, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব
  • মাওলানা ইউসুফ সাদেক হক্কানী, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব
  • ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি-জাগপার সহ-সভাপতি ও মুখপাত্র
  • অ্যাডভোকেট আনোয়ারুল ইসলাম চাঁন, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি-বিডিপির চেয়ারম্যান
  • অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুল আউয়াল, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নায়েবে আমির
  • অধ্যক্ষ হাফেজ মাওলানা ইউনুস আহমাদ, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব
  • ড. হামিদুর রহমান আজাদ, জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল
  • অধ্যাপক ইকবাল হোসেন, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি-জাগপার সাধারণ সম্পাদক
  • অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর হোসাইন, খেলাফত মজলিস কেন্দ্রীয় সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব

রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট

শফিকুর রহমানের বক্তব্য বর্তমান বাংলাদেশে রাজনৈতিক উত্তেজনা ও দুর্নীতির প্রেক্ষাপটকে তুলে ধরে। তিনি সরকারের চাঁদাবাজি, প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ, দুর্নীতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে সরাসরি সমালোচনা করেছেন। সমাবেশে তিনি জনগণকে সক্রিয় থাকার আহ্বান জানিয়েছেন এবং যুবকদের ভোটের অধিকার রক্ষায় নেতৃত্ব প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

ভবিষ্যতের পরিকল্পনা ও দিকনির্দেশনা

জামায়াতের নেতার বক্তব্যে পরিষ্কার হয়েছে যে তারা আগামী নির্বাচনে জনগণকে সচেতন করতে এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় যুবক-জনতার সঙ্গে একযোগে কাজ করবে। তিনি দুর্নীতিমুক্ত, ন্যায়নিষ্ঠ এবং স্বচ্ছ সরকারের জন্য প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন। এছাড়াও দেশের সংবিধান ও রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রতি সম্মান বজায় রাখার গুরুত্বও তিনি প্রকাশ করেছেন।

শফিকুর রহমানের এই বক্তব্য রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা একটি স্পষ্ট সংকেত হিসেবে দেখছেন। তিনি বলছেন, “যে দেশের জনগণ সচেতন, তার কোনো অসাধু শক্তি ক্ষমতা দখল করতে পারবে না।”

খুলনায় অনুষ্ঠিত এই সমাবেশে জামায়াতে ইসলামী ও সহযোগী সংগঠনগুলো দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক নীতিতে পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়েছে। শফিকুর রহমানের বক্তৃতা দেশের যুবক-জনতাকে প্রেরণা জোগাচ্ছে এবং তাদের মধ্যে সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে। তিনি বারবার উল্লেখ করেছেন যে ক্ষমতার দাপট দেখানো নয়, জনগণের স্বার্থে কাজ করাই আসল।

MAH – 14088 I Signalbd.com

মন্তব্য করুন
Advertisement

Related Articles

Back to top button