রাজনীতি

‘খালেদা জিয়ার জন্য সারাদেশের মানুষ কাঁদছে, হাসিনার জন্য কথা বলারও কেউ নেই’

Advertisement

বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার গুরুতর অসুস্থতা এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক অবস্থানকে কেন্দ্র করে তীব্র মন্তব্য করেছেন গণঅধিকার পরিষদের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খাঁন। তিনি মন্তব্য করেন, ‘আজ অসুস্থ খালেদা জিয়ার জন্য সারাদেশের মানুষ কাঁদলেও, হাসিনার জন্য কথা বলার কেউ নেই।’ শনিবার (২৯ নভেম্বর) ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলার জোড়াদহ বাজারে গণসংযোগ শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এই বিস্ফোরক মন্তব্য করেন। তাঁর বক্তব্য মূলত দেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের প্রতি জনগণের বর্তমান মনোভাব এবং রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের প্রভাব তুলে ধরেছে।

দুই নেত্রীর প্রতি জনগণের প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ

গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খাঁন তাঁর বক্তব্যে বেগম খালেদা জিয়া এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি জনগণের প্রতিক্রিয়াকে সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে স্থাপন করেছেন। তিনি বলেন, বেগম খালেদা জিয়াকে ‘ভারতীয় মদদপুষ্ট হাসিনা সরকার’ বারবার কারাগারে নিয়েছে এবং তাকে ‘তিলেতিলে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে’। এর ফলস্বরূপ, আজ তাঁর অসুস্থতায় সারাদেশের মানুষ কাঁদছে

অন্যদিকে, তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে বলেন, ‘ফ্যাসিস্ট হাসিনা পালিয়েছে। তার জন্য দোয়া করা তো দূরে থাক, কথা বলার মতো মানুষ হারিকেন দিয়ে খুঁজে পাওয়া যায় না।’ তাঁর এই মন্তব্য শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের বিরুদ্ধে ব্যাপক জন-অসন্তোষ এবং বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তাঁর প্রভাব হারানোর ইঙ্গিত দেয় বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। এই তুলনাটি দেশের রাজনৈতিক বিভাজন এবং জনগণের মধ্যে বিদ্যমান ক্ষোভকে প্রতিফলিত করে।

খালেদা জিয়া সার্বভৌমত্বের প্রতীক: রাশেদ খাঁন

রাশেদ খাঁন বেগম খালেদা জিয়াকে শুধু একজন অসুস্থ নেত্রী হিসেবে নয়, বরং দেশের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক আদর্শের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি মন্তব্য করেন, ‘বেগম খালেদা জিয়া সার্বভৌমত্বের প্রতীক। তিনি আধিপত্যবাদ বিরোধী আন্দোলনের প্রতীক। গণতন্ত্র ও ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠার অগ্রসেনানী।’

তিনি জোর দিয়ে বলেন, শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগ এবং ভারতীয় চক্রান্তের পরও খালেদা জিয়া দেশ ছেড়ে চলে যাননি। এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি খালেদা জিয়াকে একজন দেশপ্রেমিক নেত্রী হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেন, যিনি কঠিন সময়েও দেশের মাটিতে অবস্থান করেছেন। বিপরীতে, তিনি শেখ হাসিনাকে ‘পলাতক’ আখ্যা দিয়ে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সমাপ্তি এবং জনবিচ্ছিন্নতার দিকে ইঙ্গিত করেন।

চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ে সরকারের সমালোচন

রাশেদ খাঁন তাঁর বক্তব্যের দ্বিতীয় ভাগে সদ্য বিদায়ী সরকারের কিছু অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের কঠোর সমালোচনা করেন। বিশেষ করে, চট্টগ্রাম বন্দরের টার্মিনাল ইজারা দেওয়ার প্রসঙ্গে তিনি সরকারের পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, এই সরকারের প্রধান কাজ ছিল ‘সংস্কার, গণহত্যার বিচার ও সুষ্ঠু নির্বাচন দেয়া’

কিন্তু তার পরিবর্তে তারা বিদেশিদের খুশি করার জন্য ‘বন্দরের নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনার দায়িত্ব তাদের হাতে তুলে দিচ্ছে’। তিনি হুঁশিয়ারি দেন যে, দেশের জনগণ এই সিদ্ধান্ত মেনে নেবে না এবং ‘চাঁদাবাজির দোহাই দিয়ে বিদেশিদের হাতে বন্দর দেয়া যাবে না’। এই বক্তব্য দেশের জাতীয় সম্পদ ও সার্বভৌমত্বের ওপর বিদেশী প্রভাব নিয়ে জনগণের উদ্বেগকেই তুলে ধরে। বন্দর ইজারার মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে জনগণের মতামতকে গুরুত্ব না দেওয়ার সমালোচনাও করেন তিনি।

উপদেষ্টাদের কমিশন বাণিজ্য ও দুর্নীতির অভিযোগ

সাবেক সরকারের উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধেও রাশেদ খাঁন গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করেন। তিনি বলেন, এই সরকারের উপদেষ্টারা ‘কমিশন বাণিজ্য করছে, দুর্নীতি করছে’। তিনি দাবি করেন যে, তার দল নানাভাবে উপদেষ্টাদের কমিশন বাণিজ্যের খবর পাচ্ছে।

তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘আগামীতে যে সরকারই আসুক, এই উপদেষ্টাদের দুর্নীতির তদন্ত করা হবে।’ এই মন্তব্যটি বর্তমান রাজনৈতিক পটভূমিতে দুর্নীতি দমনের প্রতি জনগণের উচ্চ প্রত্যাশা এবং ভবিষ্যতে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার দিকে ইঙ্গিত করে। এই ধরনের অভিযোগ রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে এবং সাধারণ মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।

রাশেদ খাঁন এই মন্তব্য করার আগে ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলার জোড়াদহ বাজারে জেলা গণঅধিকার পরিষদের উদ্যোগে গণসংযোগ করেন। এই গণসংযোগে দলটির জেলা সভাপতি প্রভাষক সাখাওয়াত হোসেন, সাধারণ সম্পাদক জাহিদ ইকবাল রাজন, যুব অধিকার পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. মিশন আলী এবং পেশাজীবী অধিকার পরিষদের জেলা সভাপতি রাসেল আহমেদসহ স্থানীয় নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।

এই গণসংযোগ কর্মসূচিটি মূলত রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে জনগণের কাছে তাদের বার্তা পৌঁছে দেওয়ার একটি অংশ। বেগম খালেদা জিয়ার অসুস্থতা এবং দেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই ধরনের কর্মসূচির মাধ্যমে গণঅধিকার পরিষদ নিজেদের অবস্থানকে আরও জোরালো করার চেষ্টা করছে।

রাজনীতির পরিবর্তিত সমীকরণ

গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খাঁনের এই মন্তব্য বাংলাদেশের রাজনীতির পরিবর্তিত সমীকরণের একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি জনগণের সহানুভূতি এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি কথিত জনবিচ্ছিন্নতা—এই দুটি বিষয়ই বর্তমান রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। বন্দরের ইজারা এবং উপদেষ্টাদের দুর্নীতি নিয়ে তাঁর কড়া বক্তব্য বর্তমান সরকারের ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ এবং জনগণের আন্দোলনের প্রতি তাঁদের অঙ্গীকারকে প্রতিফলিত করে।

তাঁর এই বক্তব্য দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। জনগণ এখন অপেক্ষা করছে, এই সমালোচনার বিপরীতে ক্ষমতাসীন দল এবং সংশ্লিষ্ট মহল কী জবাব দেয় এবং ভবিষ্যতে দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কী ধরনের পরিবর্তন আসে।

এম আর এম – ২৪২২,Signalbd.com

মন্তব্য করুন
Advertisement

Related Articles

Back to top button