বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন আবারও উত্তাল। বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন বলে জানানো হয়েছে। রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালের করোনারি কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) তিনি টানা চিকিৎসাধীন। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পরিষ্কারভাবে বলেছেন—বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত নাজুক, চিকিৎসকরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেও আশঙ্কা কাটেনি।
এমন পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনার জন্ম নিয়েছে—দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান কি এবার দেশে ফিরছেন?
দলীয় একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, পরিস্থিতি যত জটিল হচ্ছে, তারেক রহমানের দেশে ফেরার সম্ভাবনাও তত জোরালো হচ্ছে।
এই প্রতিবেদনে খালেদা জিয়ার চিকিৎসা, তারেক রহমানের সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন, বিএনপির অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতি, চিকিৎসকদের মতামত, পারিবারিক উদ্বেগ এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট—সবই বিশদভাবে তুলে ধরা হলো।
খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা: কেন সংকট বাড়ছে?
খালেদা জিয়ার চিকিৎসকরা জানিয়েছেন—তিনি বহুদিন ধরেই জটিল স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে অবস্থার আরও অবনতি হয়েছে। মূল তিনটি সমস্যা সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ সৃষ্টি করছে:
১. ফুসফুসে সংক্রমণ ও নিউমোনিয়া
- শ্বাসকষ্ট নিয়ে ভর্তি করা হয়
- দ্রুতই ফুসফুসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে
- নিউমোনিয়ার জটিলতা দেখা দেয়
চিকিৎসকদের মতে, শ্বাসযন্ত্রের এই জটিলতা তার বয়স ও অন্যান্য রোগের কারণে আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
২. দীর্ঘদিনের কিডনি, লিভার ও ডায়াবেটিস সমস্যা
- কিডনি কার্যকারিতা স্বাভাবিকের তুলনায় কম
- লিভারের পুরনো সমস্যা নতুন সংকট তৈরি করছে
- ডায়াবেটিসের ওঠানামা শরীরকে আরও দুর্বল করে দিচ্ছে
৩. হৃদ্রোগের ঝুঁকি
সিসিইউতে রাখার মূল কারণ—স্থায়ী পর্যবেক্ষণ ছাড়া খালেদা জিয়ার অবস্থা স্থিতিশীল রাখা সম্ভব নয়।
মেডিকেল বোর্ডের চিকিৎসকরা বলছেন:
“এটি কেবল একটি রোগ নয়, বরং একাধিক জটিলতার সম্মিলন। এবং তা অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় রয়েছে।”
চিকিৎসকরা সিঙ্গাপুরে নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন
এভারকেয়ার হাসপাতালের মেডিকেল বোর্ডের বেশ কয়েকজন চিকিৎসক খালেদা জিয়ার জন্য ‘অ্যাডভান্সড লাইফ সাপোর্ট ট্রিটমেন্ট’ প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেছেন।
তারা মত দিয়েছেন:
- সিঙ্গাপুরে বিশেষায়িত চিকিৎসা তার জন্য আরও কার্যকর হতে পারে
- কয়েকটি জটিল পরীক্ষাও বিদেশে করা প্রয়োজন
- এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে নেওয়ার পরিকল্পনাও প্রাথমিকভাবে আলোচনা হয়েছে
কিন্তু এর সবকিছুই সরকারের অনুমোদন এবং পরিবারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।
মির্জা ফখরুলের অবস্থান: কোনও উন্নতি নেই, উদ্বেগ বাড়ছে
গত দুই দিনে মেডিকেল রিপোর্টে উল্লেখযোগ্য কোনও উন্নতি দেখা যায়নি।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দুইবার হাসপাতালে গেছেন।
তার ভাষায়:
“বিএনপি চেয়ারপারসনের অবস্থা অত্যন্ত সংকটময়। চিকিৎসকেরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন। কিন্তু আমরা অত্যন্ত উদ্বিগ্ন।”
তিনি আরও বলেছেন—রাজনৈতিক বিবেচনা বাদ দিয়ে মানবিক কারণে সরকারকে চিকিৎসার সুযোগ দিতে হবে।
পরিবারের প্রত্যাশা ও রাজনৈতিক বাধা
এই পরিস্থিতিতে বিএনপি নেতারা জানিয়েছেন, তারেক রহমান ও তার স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান সার্বক্ষণিক খোঁজ রাখছেন।
জুবাইদা রহমান চিকিৎসা বোর্ডের সদস্য হিসেবে চিকিৎসকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করছেন।
হাসপাতালে রয়েছেন—
- সৈয়দা শামিলা রহমান (আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী)
- শামীম এস্কান্দার (খালেদা জিয়ার ছোট ভাই)
পারিবারিক সূত্র বলছে—পরিস্থিতি যত খারাপ হচ্ছে, পরিবার তত বেশি উদ্বেগে রয়েছে।
তারেক রহমানের অনলাইন পোস্ট: আবেগঘন বার্তা
সাম্প্রতিক একটি ফেসবুক পোস্টে তারেক রহমান লিখেছেন—
“যে কোনও সন্তানের মতো আমারও সংকটময় সময়ে মায়ের স্নেহস্পর্শ পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতার কারণে এই সিদ্ধান্ত এককভাবে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।”
এই বার্তাটি রাজনৈতিক মহলে আলোড়ন তোলে।
অনেকে মনে করছেন—এটি দেশে ফেরার ইঙ্গিতও হতে পারে।
তারেক রহমানের দেশে ফেরার প্রস্তুতি কি আগে থেকেই ছিল?
বিএনপির সূত্র বলছে—তারেক রহমানের দেশে ফেরার পরিকল্পনা নতুন নয়।
আগের পরিকল্পনা ছিল:
- প্রথমে সৌদি আরবে ওমরা পালন
- এরপর সরাসরি ঢাকায় আগমন
- জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর দলীয় কার্যক্রম পরিচালনা
বিএনপি তার নিরাপত্তা, বাসভবন সংস্কার এবং কার্যালয় সাজানোর প্রস্তুতিও নিয়ে রেখেছিল।
কিন্তু…
খালেদা জিয়ার হঠাৎ অবনতি পুরো পরিকল্পনা পাল্টে দিয়েছে।
এখন যে কোনও মুহূর্তে সিদ্ধান্ত বদলে দেশে ফেরার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলে দলীয় নেতারা জানিয়েছেন।
দলীয় দৃষ্টিতে তারেক রহমানের ফেরাটা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
এখনই তার দেশে ফেরাটা গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি কারণে:
- খালেদা জিয়ার চিকিৎসা নিয়ে পারিবারিক সিদ্ধান্ত
- বিএনপির নেতৃত্বকে ঐক্যবদ্ধ রাখা
- নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণ
- দলের মাঠের নেতাদের মনোবল ধরে রাখা
- মায়ের সংকটময় পরিস্থিতিতে পারিবারিক দায়িত্ব পালন
বিএনপির অভ্যন্তরীণ সূত্র বলছে—দলের সব স্তরে নেতারা মনে করছেন, সিদ্ধান্ত যাই হোক, তারেক রহমানকে সামনে আসতেই হবে।
জাতীয় নির্বাচনের প্রেক্ষাপট: রাজনীতিতে বাড়ছে উত্তেজনা
ডিসেম্বরের শুরুতেই জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার কথা রয়েছে।
এমন সময়ে খালেদা জিয়ার সংকট রাজনীতিতে নতুন অনিশ্চয়তার সৃষ্টি করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে—
- খালেদা জিয়ার সংকট বিএনপিকে একটি কঠিন বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়েছে
- তারেক রহমানের দেশে ফেরা রাজনীতিকে বড় ধরনের প্রভাবিত করবে
- নির্বাচনের আগে বিএনপি সংগঠনে নতুন রূপ দিতেও পারে
- অন্যদিকে সরকার পরিস্থিতিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে
এভারকেয়ার হাসপাতালে বিএনপি নেতাদের ভিড়
খালেদা জিয়ার অবস্থা জানতে আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন মহলের উৎসুকতা থাকলেও বিএনপি নেতাদের ভিড় সবচেয়ে বেশি।
গতকাল হাসপাতালে ছিলেন:
- মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর
- খোন্দকার মোশাররফ হোসেন
- গয়েশ্বর চন্দ্র রায়
- আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী
- সেলিমা রহমান
- দলের অনেক নেতাকর্মী
হাসপাতালের নিচে প্রায় সারাদিনই ছিল নেতাকর্মীদের অবস্থান।
এটি পরিস্থিতির গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
তারেক রহমানের দেশে ফেরার সম্ভাব্য তারিখ: কী বলছে সূত্র?
দলীয় সূত্রগুলোর মতে—
খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা আরও অবনতি হলে তারেক রহমান অপেক্ষা না করে দ্রুত দেশে ফিরবেন।
সম্ভাব্যতা তিনটি:
- অত্যন্ত জরুরি পরিস্থিতিতে—যে কোনও সময়
- নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগেই
- মানবিক দিক বিবেচনায় রাজনৈতিক বাধা সত্ত্বেও দ্রুত সিদ্ধান্ত
তবে সবকিছু নির্ভর করছে পরিস্থিতির ওপর।
চিকিৎসা, রাজনীতি ও পরিবারের সংকট—সব মিলিয়ে এক গভীর অনিশ্চয়তা
বর্তমান সময়টি খালেদা জিয়ার পরিবার, রাজনৈতিক দল ও দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
- পরিবারের জন্য—এটি সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার সময়
- বিএনপির জন্য—নেতৃত্বের নতুন পরীক্ষার মুহূর্ত
- দেশের জন্য—রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার বড় চ্যালেঞ্জ
খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ কমছে না।
একদিকে চিকিৎসার জরুরি প্রয়োজন, অন্যদিকে রাজনৈতিক বাস্তবতা।
তারেক রহমানের দেশে ফেরার প্রশ্নটি এখন শুধু রাজনৈতিক নয়—মানবিকও।
পরবর্তী কয়েক দিন পুরো দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রাজনীতি, চিকিৎসা, সিদ্ধান্ত—সবকিছুই এই সময়ের ওপর নির্ভর করছে।
MAH – 14033 I Signalbd.com



