কালশী ফ্লাইওভারে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা: প্রাইভেট কারের ধাক্কায় প্রাণ গেল দুই তরুণ বন্ধুর

রাজধানীর উত্তরা-পল্লবী সংযোগকারী গুরুত্বপূর্ণ কালশী ফ্লাইওভারে গতকাল রাতের একটি ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে দুই তরুণ বন্ধু। একটি দ্রুতগামী প্রাইভেট কারের ধাক্কায় মোটরসাইকেলে থাকা এই দুই আরোহী ছিটকে পড়ে গুরুতর আহত হন এবং পরে হাসপাতালে নেওয়ার পর তাঁদের মৃত ঘোষণা করা হয়।
নিহতদের পরিচয়
নিহত দুই তরুণের একজন মো. তোফাজ্জল (১৬) এবং অন্যজন রিয়াদ হোসেন (১৮)। তোফাজ্জল ছিলেন মোটরসাইকেলটির চালক। তাঁদের দুজনের বন্ধুত্ব ছিল গভীর এবং তারা একসঙ্গে বেড়াতে বের হয়েছিল বলেই জানা গেছে।
রিয়াদ ছিলেন চাঁদপুর জেলার বাসিন্দা এবং ঢাকায় ঘুরতে এসেছিলেন তাঁর বন্ধু তোফাজ্জলের বাসায়। তোফাজ্জলের বাড়ি কিশোরগঞ্জ হলেও সে মাটিকাটা এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করত।
কীভাবে ঘটল দুর্ঘটনা?
পল্লবী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আতিকুর রহমান জানিয়েছেন, রাত প্রায় পৌনে ১০টার দিকে কালশী ফ্লাইওভারে একটি বেপরোয়া গতির প্রাইভেট কার মোটরসাইকেলটিকে পেছন থেকে ধাক্কা দেয়। এতে তোফাজ্জল ও রিয়াদ দুজনই সড়কে ছিটকে পড়ে গুরুতর আহত হন।
প্রথমে তাঁদের স্থানীয় একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে রাত সাড়ে ১১টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে স্থানান্তর করা হয়। সেখানেই চিকিৎসক তাঁদের মৃত ঘোষণা করেন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা
দুর্ঘটনার পরপরই প্রাইভেট কারটি জব্দ করা হয়েছে এবং চালককে আটক করেছে পুলিশ। বর্তমানে চালককে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে এবং তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে।
ময়নাতদন্ত ও আইনি পদক্ষেপ
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, নিহতদের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পাওয়ার পরই চূড়ান্ত রিপোর্ট তৈরি করবে পুলিশ।
পরিবারের শোক ও প্রতিক্রিয়া
রিয়াদের মামাতো ভাই রাসেল মিয়া জানিয়েছেন, “রিয়াদ গ্রাম থেকে ঢাকায় ঘুরতে এসেছিল। তোফাজ্জলের সাথে ঘোরাঘুরি করছিল। কে জানতো এটাই তাদের শেষ দেখা হবে। পরিবারে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।”
তাদের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, তোফাজ্জল সদালাপী ও বন্ধুবান্ধবপ্রিয় ছিল। স্থানীয় মাদরাসায় পড়াশোনার পাশাপাশি ছোটখাটো কাজে যুক্ত ছিল সে। অপরদিকে, রিয়াদ এক কলেজে দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ত।
বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার ভয়াবহ চিত্র
বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা এখন একটি ভয়াবহ সামাজিক সংকটে রূপ নিয়েছে। প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ সড়কে প্রাণ হারাচ্ছে। বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে প্রায় ৯ হাজার মানুষ। এর মধ্যে বড় অংশই তরুণ ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী।
দ্রুতগামী ও বেপরোয়া যানচালনা, ট্রাফিক নিয়ম না মানা, ড্রাইভারের প্রশিক্ষণের অভাব এবং যান্ত্রিক ত্রুটি — এই সব মিলিয়ে প্রতিদিনই ঘটছে মর্মান্তিক সব দুর্ঘটনা।
আইন কি বলে?
বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে ‘সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮’ প্রণয়ন করা হলেও এর প্রয়োগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে। আইন অনুযায়ী, বেপরোয়া গতি ও অসতর্ক চালনার কারণে মৃত্যু ঘটলে, সংশ্লিষ্ট চালকের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলার আওতায় ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।
সচেতনতা ও দায়িত্বশীলতার প্রয়োজন
সড়ক দুর্ঘটনা রোধে শুধু আইন করলেই চলবে না, প্রয়োজন জনসচেতনতা, দায়িত্বশীল চালনা, এবং কঠোর নজরদারি। যারা প্রাইভেট গাড়ি কিংবা মোটরসাইকেল চালান, তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণ ও ট্রাফিক নিয়ম সম্পর্কে সচেতনতা থাকা জরুরি।
বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে হেলমেট পরা, ট্রাফিক সিগনাল মেনে চলা এবং বেপরোয়া গতিতে না চলার মতো বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। না হলে আরও অনেক সম্ভাবনাময় জীবন অকালে থেমে যাবে।
তোফাজ্জল ও রিয়াদের মতো তরুণদের মৃত্যু আমাদের সমাজের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। এই ঘটনা যেন আর কোনো পরিবারে অকাল শোক না আনে, তার জন্য রাষ্ট্র, প্রশাসন এবং সমাজের প্রতিটি মানুষের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন জরুরি।