বাংলাদেশ

পাকিস্তানের সঙ্গে পরিকল্পিতভাবে সম্পর্ক খারাপ করে রাখা হয়েছিল

Advertisement

বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন বলেছেন, পূর্ববর্তী সময়ে পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ইচ্ছাকৃত ও পরিকল্পিতভাবে খারাপ অবস্থায় রাখা হয়েছিল। দেশের পররাষ্ট্রনীতিকে সুস্থ ও ভারসাম্যপূর্ণ পথে ফিরিয়ে আনতে বর্তমান সরকার কাজ করছে বলেও তিনি জানান।

রোববার (৩০ নভেম্বর) জাতীয় প্রেসক্লাবে ডিপ্লোম্যাটিক করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিক্যাব) আয়োজিত ‘ডিক্যাব টক’-এ সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। তার বক্তব্যকে কেন্দ্র করে কূটনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক কেন ঠাণ্ডা হয়ে গিয়েছিল

পররাষ্ট্র উপদেষ্টা স্পষ্টভাবে বলেন,
“পাকিস্তানের সঙ্গে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সম্পর্ক খারাপ করে রাখা হয়েছিল। এটি ছিল রাজনৈতিক বিবেচনা থেকে নেওয়া সিদ্ধান্ত।”

বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর থেকেই নানা পর্যায়ে ওঠানামা করেছে। তবে গত এক যুগের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দুই দেশের যোগাযোগ আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, আঞ্চলিক শক্তির প্রভাব এবং দ্বিপাক্ষিক সমস্যাগুলোর কারণে সম্পর্ক কখনও সাজানোভাবে উষ্ণ হয়নি।

বাংলাদেশের প্রতি পাকিস্তানের কিছু অতীত অবস্থান—বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের গণহত্যার জন্য দুঃখ প্রকাশ না করা, ভিসা জটিলতা, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের সীমিত যোগাযোগ—এসবও সম্পর্ককে অগ্রসর হতে দেয়নি।

তবে তৌহিদ হোসেন মনে করেন, সম্পর্ক খারাপ রাখার পেছনে নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে অন্য রাজনৈতিক হিসাব কাজ করেছে।
তিনি বলেন,
“এখন আমরা স্বাভাবিক সম্পর্ক চাই। কোনও দেশের সঙ্গেই অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনা বজায় রাখার নীতি নতুন সরকার অনুসরণ করবে না।”

পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন দৃষ্টিভঙ্গি

অন্তর্বর্তী সরকারের অবস্থান হলো—কূটনীতির মূল উদ্দেশ্য দেশের স্বার্থ রক্ষা ও বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বাড়ানো। তাই পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় রচনার ইঙ্গিত দিয়েছেন উপদেষ্টা।

তিনি আরও বলেন,
“একটি সুস্থ পররাষ্ট্রনীতি কখনও একপাক্ষিক হতে পারে না। সকল প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ ও বাস্তবসম্মত সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে।”

বর্তমানে পাকিস্তান বাংলাদেশের শ্রমবাজারে আগ্রহী, একাধিক খাতে ব্যবসায়িক সহযোগিতা বাড়াতে চায়। দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতেও দুই দেশকে নির্দিষ্ট দূরত্বে ধরে রাখা দীর্ঘমেয়াদে কারও জন্যই লাভজনক নয় বলেই বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে নতুন বিশ্লেষণ

প্রেসক্লাবে প্রশ্নোত্তর পর্বে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন তৌহিদ হোসেন।

তিনি বলেন,
“বিগত সরকার বলেছিল, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক অত্যন্ত উষ্ণ। কিন্তু ওই উষ্ণ সম্পর্ক দিয়েও সীমান্ত হত্যা, নদীর পানির প্রাপ্যতা কিংবা বাণিজ্য ভারসাম্যের মতো মৌলিক সমস্যা সমাধান হয়নি।”

তার মতে, দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক সম্পর্ক দিল্লি-ঢাকা সরকারি পর্যায়ে দৃশ্যমান হলেও—বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে ভারতের প্রতি আস্থা বা সন্তুষ্টি বাড়েনি।

সীমান্ত হত্যা পৃথিবীর একমাত্র ‘নন-ওয়ার জোন’ কিলিং

উপদেষ্টা উল্লেখ করেন,
“পৃথিবীর কোথাও যুদ্ধাবস্থা না থাকা সত্ত্বেও এরকম সীমান্ত হত্যা হয় না—যেমনটা ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে হয়। এটি বিশ্বের একমাত্র উদাহরণ।”

যদিও ভারত বরাবরই দাবি করে থাকে—সীমান্তে অবৈধ অনুপ্রবেশ, মাদক ও চোরাচালান প্রতিরোধেই এসব ঘটনা ঘটে। বাংলাদেশ বলছে, এসব যুক্তি কোনওভাবেই হত্যাকে বৈধতা দেয় না।

ঢাকা এই বিষয়টি বহু বছর ধরে প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে এবং ভবিষ্যতেও জানাতে থাকবে।

নদীর পানি বণ্টন: দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত বিষয়

দেশের ভৌগোলিক অবস্থান, অর্থনীতি ও কৃষির স্বার্থে বাংলাদেশের জন্য নদীর পানি বণ্টন একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু।

তৌহিদ হোসেন বলেন,
“ভারতের সঙ্গে উষ্ণ সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও নদীর পানি বণ্টনের সমস্যা সমাধান হয়নি। তিস্তা চুক্তি ছাড়াও অন্যান্য যৌথ নদীর ন্যায্য হিস্যা বাংলাদেশ এখনো পায়নি।”

জলবিদ ও কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন—নদীর পানি ব্যবস্থাপনা দুই দেশের রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করে। কিন্তু বাস্তবে এই খাতে কোনও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।

শেখ হাসিনাকে ফেরত না দেওয়ার ইস্যুতে সম্পর্ক আটকে থাকবে না

সাংবাদিকদের প্রশ্ন ছিল—সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে না দেওয়ার ঘটনায় ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক কি কঠিন হয়ে পড়তে পারে?

উত্তরে উপদেষ্টা বলেন,
“একজন ব্যক্তির বিষয়ে ভারতের অবস্থান দুই দেশের সামগ্রিক সম্পর্ককে আটকে দেবে—এটা মনে করি না। বাংলাদেশ তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতে কাজ করে যাবে।”

এ বক্তব্য কূটনৈতিক মহলে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কারণ, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনার অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে একটি আলোচিত প্রেক্ষাপট।

কূটনীতি চালাতে হবে সবার স্বার্থ বিবেচনায়

তৌহিদ হোসেন বলেন,
“বিদেশনীতি একটি দেশের অভ্যন্তরীণ নীতির সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। তাই আমাদের এমন নীতি প্রণয়ন করতে হবে, যা পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের জন্য পথনির্দেশক ভূমিকা পালন করবে।”

তিনি আরও জানান,
“বাংলাদেশকে বিশ্বের অনেক দেশ ভালোভাবে চিনে। কিন্তু অনেকে নেতিবাচক ভাবেও দেখে। সেই ভাবমূর্তি বদলানো জরুরি।”

বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে বিশ্বাসের সম্পর্ক পুনর্গঠনে মনোযোগী। বিশেষ করে অর্থনীতি, শ্রমবাজার, বাণিজ্য, মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া—এসব ক্ষেত্র বিশ্বব্যাপী নজরদারিতে রয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি ও বাংলাদেশের অবস্থান

বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক অবস্থান সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ এশিয়ার দুই পরাশক্তি—ভারত ও পাকিস্তান—এ অঞ্চলের কৌশলগত ভারসাম্য প্রভাবিত করে।

বিশ্লেষকদের মতে,
১. ভারতের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা
২. পাকিস্তানের সঙ্গে দীর্ঘ শীতল সম্পর্ক
৩. চীনের সঙ্গে ভারসাম্য
৪. যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারত্ব

এসবের সমন্বয় ঘটিয়ে পররাষ্ট্রনীতি চালানোই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রীয় স্বার্থের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমান সংকটময় বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে—রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, গাজা সংঘাত, ইন্দো-প্যাসিফিক নীতি, নতুন বাণিজ্য জোট গঠন—সবকিছু বিবেচনায় বাংলাদেশের জন্য বহুমাত্রিক কূটনীতি আরও জরুরি হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্ক কোথায় দাঁড়িয়ে

তৌহিদ হোসেনের মন্তব্য নতুন স্বাভাবিকতার ইঙ্গিত দিলেও দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সমস্যাগুলো এখনও পুরোপুরি নিরসন হয়নি। যেমন—

  • ১৯৭১ সালের গণহত্যা নিয়ে পাকিস্তানের অস্বীকার
  • পাকিস্তানি ভিসা প্রক্রিয়ার জটিলতা
  • বাণিজ্যিক যোগাযোগের দুর্বলতা
  • রাজনৈতিক অবিশ্বাস
  • সার্ক প্রক্রিয়ায় স্থবিরতা

তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সংবাদমাধ্যমে দেখা গেছে—পাকিস্তান বাংলাদেশের তৈরি পোশাক আমদানিতে আগ্রহী, দুই দেশের ব্যবসায়ী মহলেও আলাপ-আলোচনা চলছে।

ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক কতটা বদলাবে

বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার বলছে—ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে, সহযোগিতাও বাড়বে; তবে তা হবে জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে

নিরাপত্তা সহযোগিতা, বাণিজ্য ভারসাম্য, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, পানি ভাগাভাগি, যোগাযোগ ব্যবস্থা—এসবই নতুন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে।

আগামীদিনের সম্ভাব্য পররাষ্ট্রনীতি

তৌহিদ হোসেনের বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি দিক স্পষ্ট হয়—

১. ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি
২. আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা
৩. বাণিজ্য ও বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার
4. নদীর পানি ও সীমান্ত নিরাপত্তায় বাস্তব অগ্রগতি
5. বাংলাদেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি পুনর্গঠন

কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে—লম্বা সময় ধরে পরিচালিত এককেন্দ্রিক নীতি থেকে সরে এসে বহুমাত্রিক ও বাস্তবভিত্তিক নীতি প্রণয়ন করলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আরও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পারবে।

পাকিস্তানের সঙ্গে পরিকল্পিতভাবে সম্পর্ক খারাপ রাখা হয়েছিল—এই মন্তব্য বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে এখন দেশটি প্রতিবেশী সব দেশের সঙ্গে বাস্তবসম্মত ও স্বাভাবিক সম্পর্ক বজায় রাখার দিকে এগোতে চায়।

একই সঙ্গে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কেও নতুন দৃষ্টিভঙ্গি আনতে চায় সরকার—যেখানে উষ্ণতা নয়, বরং বাস্তব ফলাফলকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

দক্ষিণ এশিয়ার বৈচিত্র্যময় ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশ কীভাবে ভারসাম্য রক্ষা করে চলবে—তা এখন সময়ই বলে দেবে। তবে তৌহিদ হোসেনের সাম্প্রতিক মন্তব্যে ভবিষ্যৎ পররাষ্ট্রনীতির একটি স্পষ্ট দিকনির্দেশনা মিলেছে।

MAH – 14072 I Signalbd.com

মন্তব্য করুন
Advertisement

Related Articles

Back to top button