বাংলাদেশ

২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আরও ৫ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ৬৩৬

Advertisement

দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি এখনও উদ্বেগজনক অবস্থায় রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে আরও ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে এডিস মশাবাহিত এই রোগটিতে আক্রান্ত হয়ে সারাদেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ৬৩৬ জন নতুন রোগী ভর্তি হয়েছেন। রবিবার (৩০ নভেম্বর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়। নতুন মৃত্যু ও রোগীর সংখ্যা যোগ হওয়ায় চলতি বছর ডেঙ্গুতে মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৮২ জনে। বছরের শেষ সময়ে এসেও ডেঙ্গু পরিস্থিতির অবনতি দেশের জনস্বাস্থ্য এবং চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করেছে।

ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি ও মোট পরিসংখ্যান

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার সকাল ৮টা থেকে রবিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত (একদিনে) ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ৫ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে। এই ৫ জনের মৃত্যু চলতি বছরের ডেঙ্গু পরিস্থিতির ভয়াবহতাকেই তুলে ধরে। জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত সবমিলিয়ে ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৮২ জনে।

ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা এবং মৃত্যুর হার উভয়ই এখনও উচ্চ। পরিস্থিতি সামাল দিতে হাসপাতালগুলোতে বিশেষ ডেঙ্গু ওয়ার্ড চালু রাখা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং এডিস মশা নিয়ন্ত্রণের ব্যর্থতার কারণেই এই রোগটি বছরের অধিকাংশ সময় ধরে জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি সৃষ্টি করছে।

২৪ ঘণ্টায় ৬৩৬ জন নতুন রোগী: বিভাগীয় চিত্র

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে গত ২৪ ঘণ্টায় (একদিনে) ৬৩৬ জন নতুন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার তথ্য জানানো হয়েছে। দেশের বিভিন্ন বিভাগে ডেঙ্গু সংক্রমণের চিত্র:

বিভাগনতুন রোগী সংখ্যা
ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন১৪৭ জন
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন৭৪ জন
ঢাকা বিভাগ (সিটি কর্পোরেশনের বাইরে)১১৬ জন
চট্টগ্রাম বিভাগ৯৫ জন
বরিশাল বিভাগ৭৫ জন
খুলনা বিভাগ (সিটি কর্পোরেশনের বাইরে)৫৬ জন
ময়মনসিংহ বিভাগ৪৫ জন
রাজশাহী বিভাগ১৭ জন
সিলেট বিভাগ৯ জন
রংপুর বিভাগ২ জন

এই পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যায় এখনও ঢাকা বিভাগ শীর্ষে রয়েছে, তবে অন্যান্য বিভাগেও এর ব্যাপক বিস্তার রয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা উত্তর সিটিতে রোগীর সংখ্যা সর্বাধিক। সিটি কর্পোরেশনের বাইরে ঢাকা বিভাগেও রোগী ভর্তির সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বেশি।

চলতি বছরের সামগ্রিক চিত্র ও পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ডেঙ্গু

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে সবমিলিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৯৪ হাজার ৪০২ জন রোগী। একই সময়ে সারা দেশে ৮০৩ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন। এ নিয়ে চলতি বছর মোট ছাড়পত্র পেয়েছেন ৯২ হাজার ২৫ জন

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে পূর্ববর্তী বছরগুলোর ডেঙ্গু পরিস্থিতির একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হয়, যা বর্তমান সংকটের মাত্রা বুঝতে সাহায্য করে:

  • ২০২৪ সাল: জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ জন এবং মোট মৃত্যুবরণ করেন ৫৭৫ জন
  • ২০২৩ সাল: ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মোট ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন হাসপাতালে ভর্তি হন এবং মোট মৃত্যু হয় ১ হাজার ৭০৫ জনের

এই তথ্যানুসারে, ২০২৩ সালের তুলনায় চলতি বছর আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা কম হলেও, বছরের শেষেও দৈনিক আক্রান্তের হার ৬০০-এর ওপরে থাকা জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের ব্যর্থতা: জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের পদক্ষেপ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মতে, ডেঙ্গু এখন আর কেবল বর্ষাকালের রোগ নয়, বরং এটি বারো মাস ধরে জনস্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করছে। এর প্রধান কারণ হলো, এডিস মশা নিয়ন্ত্রণের জন্য সিটি কর্পোরেশন এবং স্থানীয় সরকার সংস্থাগুলোর দীর্ঘমেয়াদী ও সমন্বিত পরিকল্পনার অভাব।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল লার্ভা নিধন কর্মসূচি নয়, বরং নাগরিকদের সচেতনতা বৃদ্ধি, জলাবদ্ধতা নিরসন, এবং ডেঙ্গু পরীক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণের ওপর জোর দিতে হবে। পাশাপাশি, ডেঙ্গুর ধরন বা সেরোটাইপ পরিবর্তনের কারণেও রোগটি আরও মারাত্মক হচ্ছে কিনা, তা নিয়ে গবেষণার প্রয়োজন। অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং নির্মাণাধীন ভবনে জমে থাকা পানি এডিস মশার প্রজনন ক্ষেত্র বাড়িয়ে দিচ্ছে।

চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর চলমান চাপ

একদিকে ডেঙ্গু রোগী ভর্তির উচ্চ হার এবং অন্যদিকে অন্যান্য রোগের চিকিৎসা—এ দুয়ে মিলে দেশের হাসপাতালগুলোর ওপর চলমান চাপ তীব্র হচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, এবং সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মতো সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীর ভিড় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা।

রোগী ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি, ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসায় ব্যবহৃত প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, যেমন স্যালাইন এবং রক্ত পরিসঞ্চালনের জন্য রক্তের প্লেটলেট সরবরাহের ঘাটতি যেন না হয়, সেদিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে সতর্ক থাকতে হবে। চিকিৎসার গুণগত মান বজায় রাখা এবং ডেঙ্গু শক সিনড্রোমে আক্রান্ত রোগীদের জন্য নিবিড় পরিচর্যা নিশ্চিত করা এখন চিকিৎসার প্রধান চ্যালেঞ্জ।

ভবিষ্যতের ঝুঁকি ও করণীয়

ডেঙ্গু পরিস্থিতির দীর্ঘমেয়াদী নিয়ন্ত্রণ না করা গেলে ভবিষ্যতে এটি আরও বড় মহামারি রূপে দেখা দিতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো জরুরি:

  • সমন্বিত মশা নিধন কর্মসূচি: কেবল সিটি কর্পোরেশন নয়, দেশের প্রতিটি পৌরসভা ও উপজেলায় সারা বছর ধরে সমন্বিত মশা নিধন কর্মসূচি চালাতে হবে।
  • জনসচেতনতা বৃদ্ধি: নাগরিকদের নিজ নিজ বাড়িতে এডিস মশার প্রজনন ক্ষেত্র ধ্বংস করার বিষয়ে সচেতন করতে হবে।
  • তথ্য ও যোগাযোগ: ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে সঠিক ও নিয়মিত তথ্য প্রচার এবং গুজব রোধ করতে হবে।
  • চিকিৎসা প্রস্তুতি: হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু ওয়ার্ডের সক্ষমতা বাড়ানো এবং পর্যাপ্ত সংখ্যক চিকিৎসক ও নার্সের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা।

ডেঙ্গু সংক্রমণকে একটি জাতীয় জরুরি অবস্থা হিসেবে বিবেচনা করে কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদী সমাধান খুঁজে বের করা দেশের জনস্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য।

এম আর এম – ২৪৩০,Signalbd.com

মন্তব্য করুন
Advertisement

Related Articles

Back to top button