রাজধানীর গুলশানে চাঁদাবাজির অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক আবদুর রাজ্জাক বিন সুলাইমান রিয়াদের জীবনকাহিনী এখন দেশজুড়ে আলোচনায়। রিকশাচালক বাবার অভাব-অনটনের সংসারে বড় হওয়া রিয়াদ কীভাবে অল্প কয়েক বছরে কোটি টাকার মালিক হয়ে গেলেন, তা নিয়ে প্রশ্নের শেষ নেই। তার গ্রেফতারের ঘটনায় নোয়াখালীর নিজ গ্রাম নবীপুরেও শুরু হয়েছে নানা গুঞ্জন।
চাঁদাবাজির অভিযোগে হাতেনাতে আটক
গত শনিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর গুলশানে সাবেক সংসদ সদস্য শাম্মী আহমেদের বাসায় চাঁদাবাজির অভিযোগে রিয়াদসহ চারজনকে হাতেনাতে আটক করে পুলিশ। এরপর তাদের থানায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং পরদিন আদালতে হাজির করলে সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। পুলিশ বলছে, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিচিতিকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করছিল এই চক্র।
দারিদ্র্যের ঘেরাটোপ থেকে আলোচিত সমন্বয়ক
নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলার নবীপুর গ্রামের দরিদ্র পরিবারে জন্ম রিয়াদের। তার বাবা আবু রায়হান পেশায় রিকশাচালক ছিলেন। বড় ভাই চট্টগ্রামের একটি ফিশারিজ কোম্পানিতে কাজ করেন। স্থানীয় বিদ্যালয়েই শিক্ষাজীবন শুরু হলেও অভাবের কারণে পড়াশোনার ব্যয় মেটানো সম্ভব হয়নি। এলাকার মানুষ ও বিভিন্ন দাতব্য সংস্থার সহায়তায় স্কুল-কলেজের পড়াশোনা চালিয়ে যান তিনি।
পরিবারের দাবি, মানুষের দানের টাকাতেই রিয়াদের উচ্চশিক্ষার পথ তৈরি হয়। পরে তিনি ঢাকায় একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। এখান থেকেই তার ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে জড়িত হওয়ার শুরু।
হঠাৎ পরিবর্তন এবং বাড়িতে পাকা দালান
গ্রামের মানুষ জানাচ্ছেন, গত এক বছরে রিয়াদের জীবনে ব্যাপক পরিবর্তন দেখা গেছে। যে পরিবারটি টিনের জরাজীর্ণ ঘরে বসবাস করত, সেখানে বর্তমানে একটি পাকা ভবন নির্মাণের কাজ চলছে। প্রায় আড়াই মাস আগে এই ভবনের নির্মাণকাজ শুরু হয় এবং সম্প্রতি প্রথম তলার ছাদ ঢালাই সম্পন্ন হয়েছে।
একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “এক বছর আগেও ওদের ঘর ছিল পুরনো টিনের। হঠাৎ করেই এত টাকা কোথা থেকে এলো, বুঝতে পারি না। এখন দামি মোটরসাইকেল চালায়, বাড়িতে দাপট বেড়েছে।”
পরিবারের দাবি: অনুদান ও ঋণেই ভবন নির্মাণ
রিয়াদের বাবা আবু রায়হান জানান, “মানুষের সাহায্যে ছেলে পড়াশোনা করেছে। এখন সে টিউশনি করে কিছু আয় করে। ঘর বানাতে আমি কিছু টাকা জমিয়েছি, ব্র্যাক থেকে ঋণ নিয়েছি, আর কিছু ধার করেছি।”
মা রেজিয়া বেগমও একই কথা বলেন। তার দাবি, গত বছরের বন্যায় ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর সরকারি ত্রাণ এবং কিছু দাতব্য প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা পাওয়া গেছে। সেসব টাকা ও ধার করা অর্থ দিয়েই ঘরের নির্মাণকাজ চলছে।
তবে এসব দাবি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে।
রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ও নেতৃত্বের উত্থান
শৈশব থেকেই দারিদ্র্যের কারণে কষ্টের মধ্যে বড় হলেও ঢাকায় এসে রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন রিয়াদ। শোনা যায়, তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার ঘনিষ্ঠ ছিলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন প্রভাবশালী নেতার সঙ্গে তার তোলা অসংখ্য ছবি এখনও পাওয়া যায়।
গত বছরের ৫ আগস্ট থেকে তিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক পদে দায়িত্ব পান। এর পর থেকেই তার প্রভাব ও সম্পদের পরিমাণ বেড়ে যেতে থাকে বলে অভিযোগ।
প্রতিবেশীদের প্রতিক্রিয়া
রিয়াদের প্রতিবেশী মো. জুনায়েদ বলেন, “রিয়াদ আগে শান্ত স্বভাবের ছেলে ছিল। কিন্তু সমন্বয়ক হওয়ার পর তার আচার-আচরণে অনেক পরিবর্তন আসে। হঠাৎ করে টাকার মালিক হয়ে যাওয়াটা আমাদের কাছে অবাক লাগে।”
আরেকজন প্রতিবেশী বলেন, “এখন শোনা যায় সে কোটি টাকার মালিক। দামি বাইক কিনেছে, শহরে বাড়ি করছে। অথচ কয়েক বছর আগেও পরিবারটির দিন কাটতো দান-খয়রাতে।”
স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এক সাবেক সভাপতি বলেন, “আমরা এই ছেলেকে দান-খয়রাত করে পড়িয়েছি। আজ সে এমন অপরাধে জড়াবে, এটা ভাবতেও কষ্ট হয়।”
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি
পুলিশ সূত্র জানায়, রিয়াদ ও তার সহযোগীরা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তির কাছে ভয়ভীতি দেখিয়ে চাঁদা আদায় করছিলেন। এই বিষয়ে আরও তদন্ত চলছে। এ ছাড়া তার সম্পদের উৎস খুঁজে বের করার জন্য আলাদা তদন্তের প্রস্তুতি নিচ্ছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো।
কী হতে পারে পরবর্তী ধাপ?
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, এ ঘটনার পর রিয়াদের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ আসতে পারে। তদন্তে তার সম্পদের উৎস এবং অবৈধ উপার্জনের বিষয়টি পরিষ্কার হলে তার বিরুদ্ধে সম্পদ অর্জনের মামলাও হতে পারে।
তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—অভাব-অনটনের পরিবার থেকে উঠে আসা এই যুবক অল্প সময়ে কীভাবে কোটি টাকার মালিক হলেন? সেই রহস্যের জট খোলার অপেক্ষায় এখন সবাই।
এম আর এম – ০৫৭৬, Signalbd.com



