এক যুগের বেশি সময় ধরে চলা বিতর্কিত ‘স্যার’ সম্বোধন প্রথা অবশেষে বাতিল। অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ নতুন প্রটোকল রীতি নির্ধারণে গঠন করেছে পর্যালোচনা কমিটি। সম্মানসূচক ও লিঙ্গ-নিরপেক্ষ সম্বোধনের দিকেই যাচ্ছে বাংলাদেশ প্রশাসন।
সিদ্ধান্তের বিস্তারিত
বাংলাদেশের প্রশাসনিক রীতিনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত একটি বিতর্কিত নিয়মের অবসান ঘটেছে। বৃহস্পতিবার (১০ জুলাই) রাজধানীর তেজগাঁওয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে উচ্চপদস্থ সরকারি নারী কর্মকর্তাদের ‘স্যার’ বলে সম্বোধন করার প্রথা আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করা হয়।
সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, সম্মানসূচক সম্বোধনের ক্ষেত্রে লিঙ্গনিরপেক্ষ ও প্রাসঙ্গিক শব্দ ব্যবহারের নির্দেশনা প্রণয়ন করা হবে।
সভা শেষে প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার গণমাধ্যমকে জানান, “সরকারি প্রটোকল রীতি সংস্কারে আমরা একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছি। এই রীতির কারণে বহু নারী কর্মকর্তা দীর্ঘদিন ধরে পেশাগত অসম্মানের শিকার হয়েছেন।”
কোথা থেকে এল এই রীতি?
শেখ হাসিনার ১৬ বছরব্যাপী শাসনামলে প্রশাসনে প্রটোকল ও সম্মানসূচক সম্বোধনের নামে ‘স্যার’ শব্দ ব্যবহারের একটি বাধ্যতামূলক রীতি চালু হয়। এটি সব ধরনের কর্মকর্তা, পুরুষ ও নারী নির্বিশেষে প্রযোজ্য ছিল।
সমস্যা দেখা দেয় যখন নারী কর্মকর্তাদেরকেও ‘স্যার’ বলে সম্বোধন করা শুরু হয়, যা ভাষাগত ও সামাজিকভাবে অস্বাভাবিক ও বিভ্রান্তিকর হয়ে দাঁড়ায়।
নামমাত্র প্রোটোকল মানতে গিয়ে অনেক নারী কর্মকর্তাকে তাদের নিজ পরিচয় হারাতে হয়েছে — এমন মত পোষণ করেছেন সমাজবিজ্ঞানী ও প্রশাসনিক বিশ্লেষকরা।
পর্যালোচনা কমিটি গঠিত
বৈঠকে সরকারি প্রটোকল ও সম্বোধনের রীতি পর্যালোচনার জন্য দুই সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সদস্যরা হলেন:
- মোহাম্মদ ফৌজুল কবির খান (জ্বালানি, সড়ক ও রেলপথ বিষয়ক উপদেষ্টা)
- সাঈদা রিজওয়ানা হাসান (পরিবেশ ও জলসম্পদ বিষয়ক উপদেষ্টা)
এই কমিটিকে আগামী এক মাসের মধ্যে উপদেষ্টা পরিষদের বিবেচনার জন্য সুপারিশমালা পেশ করতে বলা হয়েছে, যাতে ভবিষ্যতের সরকারি সম্বোধন রীতি অধিকতর প্রগতিশীল ও সম্মানজনক হয়।
নারী কর্মকর্তাদের অভিমত
এই সিদ্ধান্তে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন অনেক নারী কর্মকর্তা। ঢাকা জেলা প্রশাসনের একজন সিনিয়র নারী কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
“প্রায় প্রতিদিনই আমাকে ‘স্যার’ বলে সম্বোধন করা হতো। এটা শুধু অস্বস্তিকরই নয়, বরং একজন নারী পেশাজীবীর স্বকীয়তা ও মর্যাদার জন্য অপমানজনক।”
তিনি আরও জানান, প্রশাসনে নারীর সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে, সেখানে লিঙ্গ-নিরপেক্ষ সম্মান প্রদর্শনের রীতি প্রয়োজন ছিল অনেক আগেই।
এই সিদ্ধান্তের তাৎপর্য ও সম্ভাব্য প্রভাব
এই পরিবর্তনটি শুধুই একটি শব্দ নয়, এটি বাংলাদেশের সরকারি প্রটোকলের একটি দৃষ্টান্তমূলক সংস্কার।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সিদ্ধান্ত:
- প্রশাসনে লিঙ্গবৈষম্য দূরীকরণে ভূমিকা রাখবে
- পেশাগত মর্যাদাবোধ বৃদ্ধি করবে
- ভবিষ্যতের সরকারি আচরণবিধি আরও আধুনিক ও গ্রহণযোগ্য হবে
বিশিষ্ট প্রশাসন বিশ্লেষক ড. নাজমুল করিম বলেন,
“এটি শুধু নারী কর্মকর্তাদের জন্যই নয়, বরং গোটা প্রশাসনিক কাঠামোর মানবিকীকরণের একটি পদক্ষেপ।”
ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা
সম্মানসূচক সম্বোধনে ‘স্যার’-এর পরিবর্তে কী ব্যবহার করা হবে, তা নির্ধারণ করবে গঠিত পর্যালোচনা কমিটি। সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে “জনাব”, “ম্যাডাম”, কিংবা শুধু পদবী ব্যবহার করার প্রস্তাব উঠে আসছে।
প্রতিবেশী দেশ ভারতেও নারী কর্মকর্তাদের ‘ম্যাডাম’ বলে সম্বোধন করা হয় — বাংলাদেশেও কি তেমন কিছু হতে চলেছে?
সারসংক্ষেপ
অবশেষে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা একটি বিভ্রান্তিকর ও বৈষম্যমূলক রীতির অবসান ঘটেছে।
এখন দেখার বিষয়, সরকার কত দ্রুত এই সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন করে এবং প্রশাসনের অন্যান্য ক্ষেত্রেও এমন সংস্কারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করে কি না।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, “এই সিদ্ধান্ত শুধু ভাষার পরিবর্তন নয় — এটি দৃষ্টিভঙ্গিরও পরিবর্তন।”
এম আর এম – ০২৭০, Signalbd.com



