মঙ্গোলিয়ায় বিরল ডাইনোসরের জীবাশ্মের সন্ধান: দুই নখ বিশিষ্ট ডাইনোসর

বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা সম্প্রতি মঙ্গোলিয়ার গোবি মরুভূমিতে একটি নতুন এবং বিরল ডাইনোসরের জীবাশ্ম আবিষ্কার করেছেন। এই ডাইনোসরটির বৈশিষ্ট্য বিশেষভাবে আকর্ষণীয়, কারণ এতে দুটি বৃহৎ নখ রয়েছে। জীবাশ্মটি একাধারে প্রাচীন জীববৈচিত্র্য ও থেরাপড ডাইনোসরের এক অদ্ভুত প্রজাতির প্রতিনিধিত্ব করে।
গবেষণায় জানা গেছে, এই ডাইনোসরের নাম “দুনোয়চুস সোগতবাতারি”, যা থেরিজিনোসরস গোষ্ঠীভুক্ত একটি প্রজাতি। সাধারণত, থেরিজিনোসরস জাতের ডাইনোসরগুলো পরিচিত ছিল তাদের দৈত্যাকার নখের জন্য। তবে, এই প্রজাতির মধ্যে দুটি নখের উপস্থিতি একেবারেই নতুন ও বিস্ময়কর।
গোবি মরুভূমিতে জীবাশ্মের সন্ধান
মঙ্গোলিয়ার গোবি মরুভূমির বায়ানশিরি অঞ্চলে এটি আবিষ্কৃত হয়েছে। এই মরুভূমি পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জীবাশ্ম সংরক্ষণস্থল হিসেবে পরিচিত। গোবি মরুভূমি বিশ্বের প্রাচীনতম এবং সবচেয়ে সমৃদ্ধ ডাইনোসরের জীবাশ্মের আধার হিসেবে পরিচিত। গবেষকরা জানান, জীবাশ্মটি ক্রিটেসিয়াস যুগের শেষভাগের—অর্থাৎ, প্রায় ১০ কোটি ৫ লাখ থেকে ৬ কোটি ৬০ লাখ বছর আগে এই ডাইনোসরটি পৃথিবীতে বাস করত।
দুনোয়চুস সোগতবাতারি: বিশাল আকৃতির এবং শক্তিশালী
গবেষকদের মতে, দুনোয়চুস সোগতবাতারি ছিল মাঝারি আকারের ডাইনোসর, যার আনুমানিক ওজন ছিল প্রায় ২৬০ কেজি। এর পেছনের পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে চলা ছিল এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ডাইনোসরের দৈর্ঘ্য প্রায় ১০ মিটার হতে পারে। সাধারণত থেরিজিনোসরস প্রজাতির ডাইনোসরদের তিনটি বিশাল নখ থাকত, তবে এই নতুন প্রজাতির মধ্যে দুটি বড় নখই বিশেষভাবে আকর্ষণীয়।
এই বিশাল নখের গঠন ও ভূমিকা নিয়ে গবেষকরা বিভিন্ন তত্ত্ব প্রদর্শন করেছেন। তাঁদের ধারণা, এই নখগুলি গাছের ডাল আঁকড়ে ধরার কাজে ব্যবহৃত হতে পারে। আবার, মাটি খোঁড়া বা শিকার ধরার কাজে ব্যবহৃত নখটি একটি ভয়ংকর অস্ত্র হিসেবেও ব্যবহৃত হত।
অদ্ভুত আকৃতি ও শক্তিশালী অস্ত্র
গবেষণার মাধ্যমে জানা যায় যে, এই প্রজাতির ডাইনোসরের নখগুলোর দৈর্ঘ্য প্রায় এক ফুট, যা এর শরীরের অনেক অংশের চেয়ে বড়। এই বিশাল নখগুলি খুবই শক্তিশালী ছিল এবং এটি ডাইনোসরের শিকার ধরতে, আত্মরক্ষায় বা গাছের ডাল আঁকড়ে ধরতে কার্যকরী ছিল। দারলা জেলেনিটস্কি, কানাডার ক্যালগেরি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক, বলেন, “এ প্রজাতির ডাইনোসর দেখতে বিশাল এবং অদ্ভুত। এটি যে ধরণের ডাইনোসর, তা একেবারেই অদ্ভুত ধরনের শিকারি এবং চিত্তাকর্ষক ছিল।”
বিজ্ঞানীদের নতুন আবিষ্কার: থেরিজিনোসরস প্রজাতির বিশাল নখ
এ প্রজাতির ডাইনোসরের বিশেষত্ব হল তার শক্তিশালী এবং বৃহৎ নখ, যা পৃথিবীর অন্যান্য ডাইনোসরের তুলনায় অনেক বেশি বিরল। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এই ডাইনোসরের শক্তিশালী নখের কারণে এটি শিকার ধরতে সক্ষম ছিল এবং বড় আকারে গাছের ডালেও শক্তিশালীভাবে আঁকড়ে ধরতে পারত। থেরিজিনোসরস প্রজাতির অন্যান্য ডাইনোসরও সাধারণত শক্তিশালী নখ দিয়ে শিকার ধরত, কিন্তু দুনোয়চুস সোগতবাতারি তার নখের আকারে আরও উন্নত ছিল।
গোবি মরুভূমি: ডাইনোসরের জীবাশ্মের বৃহত্তম আধার
মঙ্গোলিয়ার গোবি মরুভূমি শুধুমাত্র এই জীবাশ্মের জন্য নয়, বরং এটি পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং পুরনো ডাইনোসরের জীবাশ্মের আধার হিসেবে পরিচিত। ইউনেস্কো কর্তৃক এটি বিশ্ব ঐতিহ্যস্থল হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে এবং এটি ডাইনোসরের বিবর্তনের নানা চমকপ্রদ দিকের অন্যতম সাক্ষী।
গোবি মরুভূমি ক্রিটেসিয়াস যুগের শেষভাগের সময়কালের জীবাশ্ম সংরক্ষণে বিশেষভাবে সমৃদ্ধ। এখানকার জীবাশ্মগুলি প্রাচীন জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে অনেক মূল্যবান তথ্য প্রদান করে এবং বিশেষভাবে ডাইনোসরের বিবর্তন সম্পর্কিত নানা জ্ঞান বৃদ্ধি করছে।
ডাইনোসরের অবলুপ্তি এবং নতুন অনুসন্ধান
প্রায় ৬৫ কোটি বছর আগে ডাইনোসররা পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত হয়ে যায়, তবে গবেষকরা প্রতিনিয়ত তাদের জীবাশ্ম থেকে নতুন তথ্য সংগ্রহ করছেন। গোবি মরুভূমির জীবাশ্মগুলি তাদের বিবর্তনীয় প্রক্রিয়া ও সময়সীমা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করছে। এই নতুন আবিষ্কারটি শুধু ডাইনোসরের জীববৈচিত্র্যই প্রকাশ করছে না, বরং পৃথিবীর প্রাকৃতিক ইতিহাসের আরও অনেক অজানা দিক উন্মোচন করছে।
মঙ্গোলিয়ার গোবি মরুভূমি: ডাইনোসরের প্রাচীন রাজত্ব
গোবি মরুভূমি বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত প্রাকৃতিক স্থান, যেখানে গত কয়েক দশকে ডাইনোসরের জীবাশ্মের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার হয়েছে। এটি শুধু মঙ্গোলিয়ারই নয়, পৃথিবীজুড়ে জীবাশ্ম অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে একটি অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, এই মরুভূমি থেকে আরও বহু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাবে যা ডাইনোসরের রাজত্ব সম্পর্কে নতুন নতুন ধারণা প্রদান করবে।
মঙ্গোলিয়ার গোবি মরুভূমিতে দুনোয়চুস সোগতবাতারি প্রজাতির এই বিরল ডাইনোসরের জীবাশ্মের আবিষ্কার প্রমাণ করে যে পৃথিবীজুড়ে ডাইনোসরের রূপ, জীবনযাপন ও বিবর্তন সম্পর্কে আমাদের জানা অনেক কিছুই অজানা রয়ে গেছে। গবেষণার এই নতুন দিকগুলি শুধুমাত্র বিজ্ঞানী-গবেষকদের জন্য নয়, সাধারণ মানুষের জন্যও এক বিস্ময়কর জানার বিষয়। এসব গবেষণা পৃথিবীর প্রাচীন ইতিহাসের আরও নতুন অধ্যায় উন্মোচন করবে, যা আমাদের পৃথিবীর প্রাকৃতিক ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে।