বিশ্ব

ইসরায়েলের  প্রেসিডেন্টের কাছে ক্ষমা চাইলেন নেতানিয়াহু

Advertisement

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দেশটির প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে চলমান ঘুষ, জালিয়াতি এবং বিশ্বাসভঙ্গের গুরুতর অভিযোগে ইসরায়েলের আদালতে বিচার চলছে। নেতানিয়াহু এই আইনি প্রক্রিয়া থেকে রেহাই পেতেই প্রেসিডেন্টের কাছে ক্ষমার আবেদন করলেন বলে জানা গেছে। প্রেসিডেন্ট হারজগের দপ্তর জানিয়েছে, এই ‘গুরুত্বপূর্ণ’ আবেদনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তিনি বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের মতামত নেবেন। দুর্নীতির মামলায় অভিযুক্ত থাকা অবস্থায় একজন ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রীর এই ধরনের আবেদন ইসরায়েলের ইতিহাসে নজিরবিহীন এবং এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে। নেতানিয়াহু অবশ্য তাঁর বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

ক্ষমার আবেদন ও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা

ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগের কাছে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমার আবেদন জমা দিয়েছেন। প্রেসিডেন্ট হারজগের কার্যালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে যে, নেতানিয়াহুর পক্ষ থেকে একটি অনুরোধ তাদের কাছে এসেছে, যার ‘উল্লেখযোগ্য প্রভাব’ রয়েছে। রোববার প্রেসিডেন্টের দপ্তর নেতানিয়াহু স্বাক্ষরিত ক্ষমার আবেদনের চিঠিটি প্রকাশ করে।

প্রেসিডেন্ট হারজগ এই বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করবেন বলে জানিয়েছেন। তাঁর দপ্তর থেকে বলা হয়েছে, প্রাসঙ্গিক সমস্ত মতামত পাওয়ার পর প্রেসিডেন্ট ‘দায়িত্বশীলতা এবং আন্তরিকতার সঙ্গে’ অনুরোধটি বিবেচনা করবেন। তবে হারজগ কবে নাগাদ এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাবেন, সে সম্পর্কে কোনো ইঙ্গিত দেওয়া হয়নি। দেশের বেসিক ল অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট ‘দোষী ব্যক্তিকে ক্ষমা করা বা তার শাস্তি কমানো কিংবা পরিবর্তন করার ক্ষমতা’ রাখেন।

নেতানিয়াহুর যুক্তি: জাতীয় স্বার্থের বিবেচনা

বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং বিচার প্রক্রিয়াকে ‘উইচ-হান্ট’ বা হয়রানিমূলক বলে আখ্যায়িত করেছেন। তাঁর ক্ষমার আবেদনের কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেছেন, তিনি চাইলে বিচার প্রক্রিয়ার শেষ পর্যন্ত যেতে পারতেন। তবে ‘জাতীয় স্বার্থের’ বিবেচনায় তিনি ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন।

এই মন্তব্য ইঙ্গিত দেয় যে, একজন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বিচার প্রক্রিয়ায় জড়িয়ে থাকা দেশের কাজে মনোযোগ দেওয়া এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ইসরায়েলের ভাবমূর্তি রক্ষার জন্য ক্ষমার আবেদন করা তাঁর কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়েছে। তিনি দুর্নীতির তিনটি মামলায় অভিযুক্ত থাকা অবস্থায় কাঠগড়ায় দাঁড়ানো প্রথম ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী। ২০২০ সালে তাঁর বিরুদ্ধে প্রথম অভিযোগ ওঠে।

দুর্নীতির তিনটি মামলা ও অভিযোগের প্রকৃতি

নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ২০১৯ সালে দায়ের করা দুর্নীতির তিনটি পৃথক মামলা রয়েছে:

প্রথম মামলা: ঘুষ ও সুবিধা প্রদান

প্রথম মামলায় প্রসিকিউটররা অভিযোগ করেন যে, নেতানিয়াহু প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে উপঢৌকন বা সুবিধা নিয়েছেন এবং এর বিনিময়ে তাঁদের ব্যবসায়িক সুবিধা প্রদান করেছেন। এই উপঢৌকনগুলোর মধ্যে ছিল দামি উপহার এবং অন্যান্য আর্থিক সুবিধা।

দ্বিতীয় মামলা: সংবাদ কাভারেজ বাড়ানোর চেষ্টা

দ্বিতীয় মামলায় অভিযোগ করা হয়, একটি ইসরায়েলি পত্রিকার প্রচার বাড়াতে সহায়তা করার জন্য তিনি সহযোগিতা করেছিলেন। বিনিময়ে, ওই পত্রিকার মাধ্যমে নিজের ইতিবাচক সংবাদ কাভারেজ পাওয়ার চেষ্টা করেছেন। এর মাধ্যমে তিনি গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতাকে ব্যবহার করে ব্যক্তিগত সুবিধা নিতে চেয়েছেন বলে অভিযোগ ওঠে।

তৃতীয় মামলা: টেলিকম কোম্পানির পক্ষে সিদ্ধান্ত

তৃতীয় মামলায় অভিযোগ আনা হয় যে, একটি টেলিকম কোম্পানির মালিকের পক্ষে যায় এমন গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিতে নেতানিয়াহু ব্যাপক আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। এর বিনিময়ে ওই কোম্পানির সঙ্গে সম্পর্কিত একটি সংবাদবিষয়ক ওয়েবসাইটে তিনি তাঁর ইতিবাচক কাভারেজ নিশ্চিত করেন। এই তিনটি মামলাই ঘুষ, জালিয়াতি এবং বিশ্বাসভঙ্গের মতো গুরুতর অপরাধের সাথে সম্পর্কিত।

মার্কিন প্রেসিডেন্টের অনুরোধ ও হারজগের অবস্থান

নেতানিয়াহুর এই ক্ষমার আবেদনের কয়েকদিন আগেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরায়েলি প্রেসিডেন্ট হারজগের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়ে তাঁকে নেতানিয়াহুকে ক্ষমা করে দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন। ট্রাম্প গত অক্টোবরে ইসরায়েল সফরের সময় ইসরায়েলি পার্লামেন্টেও তাঁর ভাষণে হারজগকে একই অনুরোধ করেছিলেন।

তখন হারজগ স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, ক্ষমার জন্য তাঁর কাছে আনুষ্ঠানিক আবেদন জমা দিতে হবে। ট্রাম্পের এই ধরনের অনুরোধ ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ বিচার প্রক্রিয়ার ওপর আন্তর্জাতিক প্রভাবের বিষয়টি স্পষ্ট করে তোলে। হারজগ বর্তমানে আইনি পরামর্শ নিচ্ছেন এবং সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করছেন, কারণ এই সিদ্ধান্ত দেশের বিচার ব্যবস্থার ওপর গভীর প্রভাব ফেলবে।

আইনি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণ

ইসরায়েলের বেসিক ল অনুযায়ী প্রেসিডেন্টকে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগেও ক্ষমা করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। ইসরায়েলের হাইকোর্টও পূর্বে রায় দিয়েছে যে, জনস্বার্থে বা ব্যক্তিগত পরিস্থিতি চরম হলে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগেও কাউকে ক্ষমা করা যেতে পারে। নেতানিয়াহুর এই আবেদন জনস্বার্থ এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার দোহাই দিয়ে আনা হয়েছে।

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই ক্ষমার আবেদন যদি মঞ্জুর হয়, তবে তা দেশের আইনের শাসন এবং নৈতিকতার ওপর গুরুতর প্রশ্ন তুলবে। একজন ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রীর বিচার থেকে রেহাই পাওয়া দেশের গণতন্ত্র এবং বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতার জন্য একটি বিপজ্জনক নজির সৃষ্টি করতে পারে। অন্যদিকে, যদি আবেদনটি প্রত্যাখ্যান করা হয়, তবে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। হারজগের সিদ্ধান্ত এই মুহূর্তে ইসরায়েলের রাজনীতি এবং বিচার ব্যবস্থার জন্য একটি পরীক্ষার সময়

এম আর এম – ২৪২৫,Signalbd.com

মন্তব্য করুন
Advertisement

Related Articles

Back to top button