বিশ্ব

আফগান মাটি ব্যবহার করে বিদেশে হামলার সুযোগ নেই

Advertisement

আফগানিস্তানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা ইমারাতে ইসলামিয়া আফগানিস্তান বহুবার ঘোষণা করেছে যে তারা তাদের ভূমি কোনো বিদেশি হামলা, ষড়যন্ত্র বা সহিংস কার্যক্রমের জন্য কারো হাতে তুলে দেবে না। এবারও একই কথা জোরালোভাবে তুলে ধরেছেন কাতারে নিযুক্ত আফগান রাষ্ট্রদূত মুহাম্মাদ সুহাইল শাহিন।
সিএনএন নিউজকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন:

“আমাদের নীতি একেবারে স্পষ্ট ও কঠোর। আমরা কোনো ব্যক্তিকে, কোনো গোষ্ঠীকে এবং কোনো দেশের পক্ষকেও আফগানিস্তানের মাটি ব্যবহার করে বিদেশে হামলা চালানোর অনুমতি দিই না।”

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনে হোয়াইট হাউসের কাছে ঘটে যাওয়া গোলাগুলির ঘটনায় একজন আফগান নাগরিক জড়িত থাকতে পারে বলে যে দাবি উঠেছে, তার পরিপ্রেক্ষিতেই এ মন্তব্য করেন তিনি।

ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি কাবুলের

হোয়াইট হাউস সংলগ্ন এলাকায় ঘটে যাওয়া গোলাগুলির ঘটনাটি বর্তমানে মার্কিন কর্তৃপক্ষ তদন্ত করছে। তবে নাম প্রকাশ না করে মার্কিন নিরাপত্তা সূত্র থেকে আফগান নাগরিকের সংশ্লিষ্টতার সম্ভাবনার কথা গণমাধ্যমে উঠে এলে কাবুল তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায়।

শাহিন বলেন,

“ঘটনাটি অত্যন্ত সংবেদনশীল। তাই আমাদের দাবি একটাই—একটি স্বাধীন, পূর্ণাঙ্গ এবং নিরপেক্ষ তদন্ত।”

ইমারাতে ইসলামিয়া কর্তৃপক্ষ মনে করে, তদন্ত সম্পূর্ণ হওয়ার আগে কোনো ব্যক্তির জাতীয়তা বা রাজনৈতিক পরিচিতি নিয়ে অনুমান প্রকাশ করা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও পারস্পরিক আস্থার ক্ষতি করতে পারে।

এ কারণে কাবুলের পক্ষ থেকে জোরালো আহ্বান জানানো হয়েছে—

“যে কোনো সিদ্ধান্ত কেবল প্রমাণের ভিত্তিতেই হোক, অনুমান বা পূর্বধারণার ভিত্তিতে নয়।”

বাহিরের গোয়েন্দা সংস্থার অপচেষ্টা হতে পারে: সুহাইল শাহিনের আশঙ্কা

সাক্ষাৎকারে সুহাইল শাহিন বলেন, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অনেক সময়ই নির্দিষ্ট ঘটনার মাধ্যমে কোনো দেশ বা জাতিগোষ্ঠীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার চেষ্টা হয়। তাই এই গোলাগুলির ঘটনার সঙ্গেও এমন প্রচেষ্টা যুক্ত থাকতে পারে।

তিনি বলেন,

“আমরা অস্বীকার করছি না যে কোনো বাহিরের গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক ঘটনাটি এমনভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করতে পারে, যাতে মনে হয় এটি আফগানদের দ্বারা সংঘটিত হয়েছে। তাই আমরা চাই—ঘটনার প্রকৃত তথ্য-উপাত্ত সামনে আসুক।”

এ বক্তব্য বিশ্লেষকদের মতে, আফগান সরকারের একটি কূটনৈতিক বার্তা, যেখানে তারা যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করছে—অপরিকল্পিত মন্তব্য বা গণমাধ্যমে অযাচিত তথ্য পরিবেশন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর প্রতিকূল প্রভাব ফেলতে পারে।

আইএসআই সম্পর্কে প্রশ্নে শাহিনের সতর্ক জবাব

সাক্ষাৎকারে সাংবাদিক তাঁকে সরাসরি প্রশ্ন করেন—আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে থাকা বা সীমান্তবর্তী গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক, বিশেষ করে পাকিস্তানের আইএসআই, এই ঘটনায় কোনোভাবে সম্পৃক্ত কি না?

জবাবে শাহিন বলেন:

“আমি কোনো সম্ভাবনাকেই পুরোপুরি নাকচ করছি না। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত পরিষ্কারভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়।”

বিশ্লেষকদের মতে, এই বক্তব্যে তিনি দুই ধরনের সংকেত দিয়েছেন—

১. আফগানিস্তান কোনো পক্ষকে আগেভাগে দোষারোপ করতে চায় না।
২. একই সঙ্গে তারা ইঙ্গিত দিচ্ছে—আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ঘটনাকে প্রভাবিত করতে পারে।

বিদেশে হামলা না করার আফগান নীতি—इतিহাস, প্রেক্ষাপট ও আন্তর্জাতিক গুরুত্ব

আফগানিস্তান গত দুই দশক ধরে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দেশ। ২০০১ সালের পর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন জোট আফগানিস্তানে প্রবেশ করে তালেবান সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল। সেই সময় আফগান ভূমি আল-কায়েদা নেতৃত্বের হাতে ব্যবহার হওয়ায় আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে দেশটি।

২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাহারের পর তালেবান পুনরায় ক্ষমতা নেয়। ক্ষমতা নেওয়ার পর তাদের প্রথম বড় আন্তর্জাতিক ঘোষণা ছিল—

“আমরা কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে আমাদের ভূমি বিদেশি হামলার জন্য ব্যবহার করতে দেব না।”

এ ঘোষণা ছিল কাবুলের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা তৈরির অন্যতম কৌশল।

সুহাইল শাহিন সেই নীতিকেই স্মরণ করিয়ে বলেন—

“আমাদের নীতি দীর্ঘদিনের। আমরা কখনোই চাই না আফগানিস্তান কারো যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হোক।”

হোয়াইট হাউস ঘটনার বিস্তার: মার্কিন গণমাধ্যমে কী বলা হয়েছে

যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা কর্মকর্তারা গণমাধ্যমকে বলেছেন, ঘটনাটিতে সন্দেহভাজন ব্যক্তির জাতীয়তা যাচাই করা হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি।
মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে—

যদি কোনো ব্যক্তির আফগান সংযোগ থাকে, তবুও সেটি পুরো জাতির প্রতিফলন নয়।
একজন ব্যক্তির ভুল কাজকে কোনো দেশের বিরুদ্ধে প্রমাণ হিসাবে দেখা ঠিক হবে না।

সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে আফগান শরণার্থী ও অভিবাসীর সংখ্যা বিপুল।
কিন্তু এখন পর্যন্ত তারা নিরাপত্তা হুমকির কারণ হয়নি।

কাবুলের কূটনৈতিক অবস্থান: সংঘাত নয়, স্পষ্টতা ও সত্য

আফগান সরকারের মুখপাত্র ও অন্যান্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন—

১. তারা সংঘাত চান না
২. তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্থিতিশীল কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়
৩. তারা শুধু প্রকৃত তথ্য উদ্ঘাটনকে গুরুত্ব দেয়

তারা স্পষ্ট করে বলেন—

“আমরা মনে করি—সত্য প্রকাশের মাধ্যমেই উভয় পক্ষের মধ্যে আস্থা বজায় রাখা সম্ভব।”

আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট: কেন এই মন্তব্য এত গুরুত্বপূর্ণ

বিশ্লেষকদের মতে, কয়েকটি কারণে সুহাইল শাহিনের এই বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ—

১. যুক্তরাষ্ট্র–আফগানিস্তান সম্পর্ক নতুনভাবে পুনর্গঠনের চেষ্টা চলছে

২০২১ পরবর্তী দুই দেশের সম্পর্ক বেশ শীতল।
নিরাপত্তা, মানবাধিকার, নারীশিক্ষা ও আর্থিক নিষেধাজ্ঞা—সব মিলিয়ে উত্তেজনা রয়েছে।

২. আফগানিস্তান আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেতে চায়

এ ধরনের ঘটনার সাথে আফগান নাগরিকদের নাম জড়ালে কাবুলের কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

৩. প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর রাজনীতিতে আফগানিস্তান কেন্দ্রীয় খেলোয়াড়

পাকিস্তান, ইরান, চীন ও ভারত—সবাই আফগানিস্তানের ভূরাজনৈতিক অবস্থানকে গুরুত্ব দেয়।

৪. নিরাপত্তা ইস্যুতে তালেবান সরকার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বার্তা দিচ্ছে

যে তারা সন্ত্রাসবাদ সমর্থন করে না এবং নিজেদেরকে দায়িত্বশীল সরকার হিসেবে দেখাতে চায়।

বিশ্লেষণ: আফগান সরকারের উদ্দেশ্য কী?

অনেক কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞ মনে করেন—

১. কাবুল এখন আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে চাইছে
২. তারা দেখাতে চাইছে যে তালেবান সরকার আগের মতো নয়
৩. তারা বৈশ্বিক সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের আলোচনায় নিজেদের “সহযোগী” হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়
৪. যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাত নয়, বরং সমঝোতার পথ খোলা রাখতে চায়

এ কারণে কোনো ঘটনার সাথে আফগান পরিচয় যুক্ত হওয়ার আগেই তারা কঠোর প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে।

আফগানিস্তানের জনগণের প্রতিক্রিয়া

স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী—

১. অনেক আফগান নাগরিক মনে করেন, বিদেশে কোনো ঘটনার সাথে তাদের নাম জড়ালে তারা বৈষম্যের শিকার হন
2. আফগানিস্তানের ভাবমূর্তি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়
3. বহু শরণার্থী নিরাপত্তা তল্লাশি ও অতিরিক্ত যাচাইয়ের মুখোমুখি হন

এই কারণেই আফগান জনগণের বড় অংশও চান—ঘটনার তদন্ত নিরপেক্ষ হোক এবং দোষী ব্যক্তি যেই হোক, তাকে আইনের আওতায় আনা হোক।

সাক্ষাৎকারে বারবার সুহাইল শাহিন যে বার্তা দিয়েছেন তার সারকথা হলো—

১. আফগানিস্তান কোনো বিদেশি হামলার ঘাঁটি নয়
২. তারা সবসময় নিরপেক্ষ তদন্তকে সমর্থন করে
৩. আফগান নাগরিকদের নাম রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হলে দলিল-প্রমাণসহ প্রতিবাদ জানাবে
৪. আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আফগানিস্তান সম্পর্কে ভুল ধারণা না রাখুক—এটাই তাদের মূল উদ্দেশ্য

বর্তমানে ঘটনাটির তদন্ত যুক্তরাষ্ট্রে চলছে।
তদন্ত শেষ হলে সত্য প্রকাশ পাবে—দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কও সে অনুযায়ী এগোবে।

MAH – 14066 I Signalbd.com

মন্তব্য করুন
Advertisement

Related Articles

Back to top button