গত ৩ দিন ধরে একই অবস্থায় খালেদা জিয়া, বিদেশে নেয়ার সিদ্ধান্ত দেবে মেডিকেল বোর্ড
বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা গত তিন দিন ধরে একই পর্যায়ে রয়েছে বলে জানিয়েছেন তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন। তিনি নিশ্চিত করেছেন যে, খালেদা জিয়া প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণ করতে পারছেন। তবে দেশবাসীর আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা বিদেশে চিকিৎসার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটি নির্ভর করছে মেডিকেল বোর্ডের মতামতের ওপর। শনিবার (২৯ নভেম্বর) রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে এক ব্রিফিংয়ে তিনি এই তথ্য জানান। একইসঙ্গে তিনি হাসপাতালে ভিড় না করার জন্য নেতাকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের প্রতি মানবিক অনুরোধ জানিয়েছেন, যাতে অন্য রোগীদের চিকিৎসায় কোনো ব্যাঘাত না ঘটে।
সর্বশেষ শারীরিক অবস্থার স্থিরতা ও চিকিৎসা গ্রহণ
ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেনের ব্রিফিং অনুসারে, বেগম খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে গত ৭২ ঘণ্টায় কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসেনি। তাঁর অবস্থা একই রকম স্থিতিশীল পর্যায়ে রয়েছে। এটি এক ধরনের স্বস্তির বিষয় হলেও, তাঁর সঙ্কটজনক অবস্থা এখনও কাটেনি। ব্যক্তিগত চিকিৎসক দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে বলেন, চিকিৎসার দায়িত্ব হাসপাতালের। তবে তাঁকে যতটা ভালো চিকিৎসা দেওয়া প্রয়োজন, তার সবরকম ব্যবস্থা করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, খালেদা জিয়া এখন চিকিৎসা গ্রহণ করতে পারছেন। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের একটি দল দিনরাত তাঁকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখছেন। এই মেডিকেল বোর্ডের তত্ত্বাবধানেই দেশের বাইরে ও দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্বয়ে চিকিৎসা কার্যক্রম এগিয়ে চলছে। চিকিৎসকরা তাঁর শারীরিক জটিলতাগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন এবং সে অনুযায়ী চিকিৎসা পদ্ধতি নির্ধারণ করছেন।
হাসপাতালে ভর্তি ও চলমান সংকটের সূত্রপাত
সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া গত ২৩ নভেম্বর ফুসফুসে সংক্রমণ, হৃদযন্ত্রের সমস্যা এবং বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতা নিয়ে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হন। তাঁকে তাৎক্ষণিকভাবে হাসপাতালের সিসিইউতে (CCU) নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানেই বিশেষ মেডিকেল বোর্ডের তত্ত্বাবধানে তাঁর চিকিৎসা শুরু হয়। তাঁর একাধিক শারীরিক জটিলতা রয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে লিভারের সমস্যা, কিডনি জটিলতা এবং ডায়াবেটিস।
তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসকরা বেশ কিছুদিন ধরেই বলে আসছেন যে, দেশে তাঁর চিকিৎসার জন্য আর কিছু করার নেই। তাদের মতে, সুনির্দিষ্ট রোগের উন্নত চিকিৎসার জন্য যত দ্রুত সম্ভব তাঁকে দেশের বাইরে কোনো বিশেষায়িত কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। এই গুরুতর অসুস্থতা এবং বিদেশে চিকিৎসার অনুমতি নিয়েই বর্তমানে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা চলছে।
তারেক রহমানের সমন্বয় ও দলীয় তৎপরতা
বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসা কার্যক্রমের সার্বক্ষণিক তদারকি করছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ডা. জাহিদ হোসেন জানান, তারেক রহমান নিয়মিতভাবে মেডিকেল বোর্ডের সঙ্গে সমন্বয় করছেন এবং চিকিৎসার সকল বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করছেন।
খালেদা জিয়ার অসুস্থতার এই সময়ে দলের নেতাকর্মী, পরিবারের সদস্য এবং মেডিকেল বোর্ড—সবার যৌথ সহযোগিতায় চিকিৎসা কার্যক্রম চলছে। তাঁর অসুস্থতার খবর পেয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিএনপি এবং এর অঙ্গ-সংগঠনের পক্ষ থেকে দোয়া মাহফিল ও প্রার্থনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। দলীয় নেতারা এবং সমর্থকরা প্রতিনিয়ত হাসপাতালে খোঁজ নিচ্ছেন এবং তাঁর দ্রুত সুস্থতা কামনা করছেন। এই অসুস্থতা দলের অভ্যন্তরে এক ধরণের সংহতি সৃষ্টি করেছে।
বিদেশে চিকিৎসা ও মেডিকেল বোর্ডের ভূমিকা
খালেদা জিয়াকে বিদেশে নেওয়ার বিষয়টি এখন সম্পূর্ণভাবে মেডিকেল বোর্ডের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। ডা. জাহিদ হোসেনের মতে, ‘মেডিকেল বোর্ড দেশের বাইরে নেওয়ার পরামর্শ দিলে সে বিষয়ে দ্রুত জানানো হবে। বিদেশ যাওয়ার বিষয়টি মেডিকেল বোর্ড ও পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে।’ এটি ইঙ্গিত দেয় যে, চিকিৎসকরা যদি মনে করেন যে বর্তমান পরিস্থিতিতে তাঁকে দেশের বাইরে নিয়ে যাওয়া জরুরি এবং তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে এই সিদ্ধান্ত দ্রুত নেওয়া হতে পারে।
রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, এই সিদ্ধান্তের জন্য সরকারের অনুমতি একটি বড় বিষয়। এর আগে তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে বারবার বিদেশে চিকিৎসার জন্য আবেদন করা হলেও সরকারের পক্ষ থেকে তা পুরোপুরি মঞ্জুর করা হয়নি। ফলে মেডিকেল বোর্ডের সুপারিশ একদিকে যেমন চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরবে, অন্যদিকে তেমনি সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করবে। বিশেষজ্ঞ মহল মনে করে, তাঁর জীবনরক্ষার জন্য উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করা এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও রোগীর প্রতি মানবিক আবেদন
ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন হাসপাতাল এবং চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে জনসাধারণের প্রতি একটি বিশেষ অনুরোধ জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘হাসপাতালে সবাইকে এসে ভিড় না করতে অনুরোধ জানাতে চাই। এটি একটি হাসপাতাল। খালেদা জিয়া ছাড়া এখানে আরও ৩০০ রোগী রয়েছে। তাদের চিকিৎসা যাতে ব্যাহত না হয়।’
হাসপাতালে ভিড় করা বা অযথা জমায়েত করা থেকে বিরত থাকার জন্য তিনি বিশেষভাবে আহ্বান জানান। তিনি আরও বলেন, হাসপাতালে যথাসম্ভব কম ভিড় করলে চিকিৎসকদের চিকিৎসা কার্যক্রম চালাতে সুবিধা হবে এবং অন্যান্য রোগীদেরও স্বাভাবিক চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। তাঁর এই আহ্বান একদিকে যেমন পরিবেশ রক্ষার, তেমনি অন্যান্য অসুস্থ রোগীদের প্রতি মানবিক হওয়ার বার্তা বহন করে।
“চিকিৎসার দায়িত্ব হাসপাতালের। ভালো করার মালিক আল্লাহ। তবে যতটা ভালো চিকিৎসা প্রয়োজন তার ব্যবস্থা করা হয়েছে।” —ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, বেগম খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসক
জাতীয় মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে চিকিৎসা
বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার স্থিতিশীলতা কিছুটা স্বস্তি দিলেও তাঁর গুরুতর অসুস্থতা দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেনের ব্রিফিংয়ে স্পষ্ট যে, বিদেশে চিকিৎসার সিদ্ধান্ত এখন কেবল মেডিকেল বোর্ডের সবুজ সংকেতের অপেক্ষায়।
তাঁর চিকিৎসা প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে দেশের মানুষের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও সহানুভূতি বিরাজ করছে। দলমত নির্বিশেষে মানুষ তাঁর দ্রুত সুস্থতা কামনা করছে। এখন দেখার বিষয়, মেডিকেল বোর্ড কখন এবং কী ধরনের সিদ্ধান্ত নেয় এবং সরকার সেই সিদ্ধান্তের প্রতি কী ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখায়। এই সিদ্ধান্তই পরবর্তী সময়ে দেশের রাজনীতি ও চিকিৎসার গতিপথ নির্ধারণ করবে।
এম আর এম – ২৪২১,Signalbd.com



