বিশ্ব

ইস্তাম্বুলের মসজিদে শ্রদ্ধার সাথে ‘জুতা’ খুলে পরিদর্শন করলেন পোপ লিও

Advertisement

ক্যাথলিক চার্চের প্রধান পোপ লিও চতুর্দশ তাঁর তুরস্ক সফরের অংশ হিসেবে প্রথমবারের মতো ইস্তাম্বুলের একটি ঐতিহাসিক মসজিদ পরিদর্শন করেছেন। শনিবার (২৯ নভেম্বর) তিনি ১৭শ’ শতকের বিখ্যাত সুলতান আহমেদ মসজিদ (যা ব্লু মসজিদ নামে পরিচিত) পরিদর্শনে যান। মসজিদের অভ্যন্তরে প্রবেশের আগে তিনি মুসলিম রীতিনীতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে নিজের জুতো খুলে কেবল সাদা মোজা পরে ভেতরে প্রবেশ করেন। ভ্যাটিকান জানিয়েছে, পোপ লিও অত্যন্ত ‘নীরবতা ও শ্রদ্ধার সঙ্গে পরিদর্শন’ করেছেন। তাঁর এই পদক্ষেপ আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি এবং দুই ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান প্রদর্শনের এক জোরালো বার্তা দিয়েছে। পোপের এই পরিদর্শন তাঁর পূর্বসূরিদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে তুরস্কের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের প্রতি ক্যাথলিক চার্চের শ্রদ্ধাবোধের প্রকাশ।

ব্লু মসজিদ পরিদর্শন: শ্রদ্ধা ও নীরবতা

পোপ লিও চতুর্দশ স্থানীয় মুসলিম নেতাদের সঙ্গে নিয়ে ব্লু মসজিদের বিশাল প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখেন। এই মসজিদ তুরস্কের সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয় ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মসজিদটি মূলত এর অসাধারণ নীল টাইলস এবং ছয়টি মিনার ও বিশাল গম্বুজের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত।

পোপ মসজিদের উঁচু টাইলযুক্ত গম্বুজ এবং কলামে আরবি শিলালিপিগুলো ঘুরে দেখেন এবং মুসলিম ধর্মীয় বিষয়ক অধিদপ্তরের প্রধানের কাছ থেকে মসজিদের ইতিহাস ও তাৎপর্য সম্পর্কে জানতে চান। ভ্যাটিকান নিশ্চিত করেছে যে, পোপ সেখানে ‘সংক্ষিপ্ত মিনিটের নীরব প্রার্থনা’ পালন করেছেন। তাঁর পূর্বসূরি পোপ বেনেডিক্ট ২০০৬ সালে এবং পোপ ফ্রান্সিস ২০১৪ সালেও এই মসজিদে নীরব প্রার্থনা করেছিলেন। পোপের জুতো খুলে সাদা মোজা পরে কার্পেটযুক্ত মসজিদের ভেতরে হাঁটা ছিল মুসলিম সংস্কৃতির প্রতি তাঁর গভীর সম্মানের প্রতীক।

ইমামের মন্তব্য ও পোপের অবস্থান

মসজিদের ইমাম আসগিন টুনকা পোপ লিওকে মসজিদ পরিদর্শনের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি জানান, তিনি পোপকে মসজিদের ভেতরে উপাসনা করার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন, তবে পোপ তা প্রত্যাখ্যান করেন।

ইমাম টুনকা পোপ লিওকে বলেছিলেন যে, মসজিদটি ‘আল্লাহর ঘর’—এটি তাঁর বা অন্য কারও ঘর নয়। টুনকা বলেন, ‘আপনি যদি চান তবে আপনি এখানে উপাসনা করতে পারেন।’ তবে পোপ জবাবে বলেন, ‘ঠিক আছে।’ ইমাম আরও বলেন, তিনি মনে করেন পোপ কেবল মসজিদটি দেখতে এবং এর ‘পরিবেশ অনুভব করতে’ চেয়েছিলেন এবং তিনি এই পরিদর্শনে খুব খুশি হয়েছিলেন। এই আলোচনাটি দেখায় যে, পোপ মূলত ধর্মীয় আচার পালনের চেয়ে আন্তঃধর্মীয় সম্পর্ককে গুরুত্ব দিয়েছেন।

পূর্বসূরিদের পদাঙ্ক এবং পোপের ধারাবাহিকতা

পোপ লিও চতুর্দশ ব্লু মসজিদ পরিদর্শনের মাধ্যমে তাঁর সাম্প্রতিক পূর্বসূরিদের ঐতিহ্যকে বজায় রাখলেন। এর আগে পোপ বেনেডিক্ট ষোড়শ এবং পোপ ফ্রান্সিস উভয়েই তুরস্ক সফরে এসে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটির প্রতি সম্মান জানাতে সুলতান আহমেদ মসজিদ পরিদর্শন করেছিলেন।

এই ধারাবাহিকতা ক্যাথলিক চার্চের পক্ষ থেকে বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম দেশগুলোর একটির প্রতি আন্তঃধর্মীয় সংলাপ এবং শ্রদ্ধার নীতিকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে। এই ধরনের উচ্চ-পর্যায়ের পরিদর্শন দুটি প্রধান বিশ্বধর্মের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি দূর করতে এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

খ্রিস্টান নেতাদের সঙ্গে বৈঠক ও যৌথ ঘোষণা

মসজিদ পরিদর্শনের পর পোপ লিও স্থানীয় খ্রিস্টান নেতাদের সঙ্গে বিভিন্ন বৈঠকে অংশ নেন। তিনি মোর এফরেমের সিরিয়াক অর্থোডক্স চার্চে তুরস্কের খ্রিস্টান নেতাদের সঙ্গে একটি ব্যক্তিগত বৈঠক করেন।

বিকেলে তিনি সেন্ট জর্জ প্যাট্রিয়ার্কাল চার্চে বিশ্বের অর্থোডক্স খ্রিস্টানদের আধ্যাত্মিক নেতা প্যাট্রিয়ার্ক বার্থোলোমিউ-১ এর সঙ্গে একটি সেবায় অংশ নেন। সেখানে তিনি এবং প্যাট্রিয়ার্ক বার্থোলোমিউ-১ ‘ভ্রাতৃত্বমূলক সম্পর্ক’ এবং ‘ধর্মের নামে হিংসা প্রত্যাখ্যানের’ বিষয়ে একটি যৌথ ঘোষণা স্বাক্ষর করেন। এই ঘোষণাটি খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের বিভিন্ন শাখার মধ্যে ঐক্যের পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব তুলে ধরে।

বিভাজন কাটিয়ে ঐক্যের বার্তা

পোপ লিও তাঁর সফরের সময় নাইসিয়ার ৩২৫ খ্রিস্টাব্দের কাউন্সিলের স্থানে খ্রিস্টান নেতাদের সঙ্গে প্রার্থনা করেন, যা তাঁর সফরের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। এই উপলক্ষ ছিল কাউন্সিলের ১,৭০০ তম বার্ষিকী উদযাপন করা। তিনি এই সময় খ্রিস্টান নেতাদের ‘দুর্ভাগ্যবশত এখনও বিদ্যমান বিভাজনের কেলেঙ্কারি কাটিয়ে উঠতে এবং ঐক্যের আকাঙ্ক্ষা লালন করতে’ অনুরোধ করেছিলেন।

পোপ বলেন, এই ধরনের ঐক্য এমন এক সময়ে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, যখন ‘অনেক মর্মান্তিক চিহ্ন রয়েছে, যেখানে মানুষ তাদের মর্যাদার জন্য অগণিত হুমকির শিকার হচ্ছে।’ ক্যাথলিক এবং অর্থোডক্স গির্জার আধ্যাত্মিক নেতৃবৃন্দের এই যৌথ উদযাপন খ্রিস্টান সমাজের মধ্যে বিভেদ দূর করে বৃহত্তর ঐক্যের দিকে এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

তুরস্কের ক্যাথলিক সম্প্রদায় ও সমাপ্তি

পোপ লিও চতুর্দশ ইস্তাম্বুলের ভক্সওয়াগেন অ্যারেনায় তুরস্কের ক্যাথলিক সম্প্রদায়ের জন্য একটি ক্যাথলিক মাসের মাধ্যমে দিনটি শেষ করেন। তুরস্কের মোট ৮৫ মিলিয়নেরও বেশি জনসংখ্যার মধ্যে মাত্র ৩৩,০০০ জন ক্যাথলিক, যাদের বেশিরভাগই সুন্নি মুসলিম।

পোপের এই সফর তুরস্কের সংখ্যালঘু খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সমর্থন হিসেবে কাজ করে। ব্লু মসজিদ পরিদর্শন, খ্রিস্টান নেতাদের সঙ্গে বৈঠক এবং ঐক্য নিয়ে তাঁর বক্তব্য ধর্মীয় সহিষ্ণুতা এবং বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠার দিকে একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত দেয়। পোপ লিও চতুর্দশের এই সফর আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি, বিশেষ করে ইসলাম এবং খ্রিস্টান ধর্মের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরির ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

এম আর এম – ২৪১৯,Signalbd.com

মন্তব্য করুন
Advertisement

Related Articles

Back to top button