জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য এ টি এম আজহারুল ইসলাম দলটির নতুন নায়েবে আমির নির্বাচিত হয়েছেন। শনিবার (২৯ নভেম্বর) সকালে রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে কেন্দ্রীয় মজলিশে শূরার অধিবেশনে তাঁকে এই গুরুত্বপূর্ণ পদে মনোনীত করা হয়। দলটির কেন্দ্রীয় প্রচার বিভাগের সিনিয়র প্রচার সহকারী মুজিবুল আলম গণমাধ্যমকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান ২০২৬-২৮ মেয়াদের জন্য নায়েবে আমির হিসেবে এ টি এম আজহারুল ইসলামের নাম প্রস্তাব করেন, যা পরবর্তীতে অধিবেশনে গৃহীত হয়। দলের অভ্যন্তরীণ নির্বাচন কমিটির কার্যক্রম অনুযায়ী আজই নায়েবে আমির হিসেবে শপথ গ্রহণ করার কথা রয়েছে এ টি এম আজহারুল ইসলামের। তার এই শীর্ষ পদে আসীন হওয়া এমন এক সময়ে ঘটল, যখন তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মৃত্যুদণ্ড থেকে আপিল বিভাগের রায়ে খালাস পেয়ে দীর্ঘ ১৩ বছর পর কারামুক্ত হয়েছেন।
দায়িত্ব গ্রহণ ও সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত
জামায়াতে ইসলামীর নতুন নায়েবে আমির হিসেবে এ টি এম আজহারুল ইসলামের নির্বাচন দলটির সাংগঠনিক কাঠামোতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। কেন্দ্রীয় মজলিশে শূরার অধিবেশনে দলের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব তাঁকে এই পদে মনোনীত করে। ২০২৬ থেকে ২০২৮ সাল পর্যন্ত দুই বছরের মেয়াদে তিনি নায়েবে আমিরের দায়িত্ব পালন করবেন। দলের জ্যেষ্ঠ প্রচার সহকারী মুজিবুল আলম নিশ্চিত করেছেন যে, অভ্যন্তরীণ নির্বাচন কমিটির প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে আজই তিনি শপথ গ্রহণ করবেন।
দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য হিসেবে জামায়াতের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তিনি এতদিন কাজ করেছেন। এখন নায়েবে আমির হিসেবে তিনি আমিরের অবর্তমানে দলের নেতৃত্ব দানসহ সাংগঠনিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে মুখ্য ভূমিকা পালন করবেন। দীর্ঘ কারাবাসের পর এমন একটি শীর্ষ পদে তাঁর আসীন হওয়া দলের অভ্যন্তরে তাঁর দৃঢ় অবস্থান এবং সাংগঠনিক গুরুত্বকেই তুলে ধরে।
বিচারিক প্রক্রিয়া: মৃত্যুদণ্ড থেকে খালাস
এ টি এম আজহারুল ইসলামের নতুন পদে আসীন হওয়ার প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করতে গেলে তাঁর দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া এবং কারাবাসের ইতিহাস অপরিহার্য। ২০১৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকালে রংপুরে সংঘটিত গণহত্যা, অপহরণ, ধর্ষণ, নির্যাতনসহ মোট ছয়টি মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে এ টি এম আজহারকে মৃত্যুদণ্ড ও বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেন।
ট্রাইব্যুনালের এই রায়ের বিরুদ্ধে তিনি আপিল করলে ২০১৯ সালের ৩১ অক্টোবর আপিল বিভাগ তাঁর মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন। পরবর্তীতে ২০২০ সালের ১৯ জুলাই তিনি আপিল বিভাগের কাছে ১৪টি যুক্তি তুলে ধরে রায় পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন করেন। এই সময় পর্যন্ত তিনি প্রায় ১৩ বছর কারাবন্দী ছিলেন।
কারামুক্তি
এ টি এম আজহারুল ইসলামের কারামুক্তির ঘটনাটি দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত। গত বছরের ৫ আগস্ট দেশে সংঘটিত গণ-অভ্যুত্থানের ফলে ক্ষমতার পট পরিবর্তন ঘটে। এরপর চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ তাঁর আপিল শুনানির অনুমতি দেন।
নিয়মিত আপিলের শুনানি শেষে চলতি বছরের ২৭ মে আদালত রায় ঘোষণা করেন। আদালতের এই রায়ে তাকে ট্রাইব্যুনাল ও আপিল বিভাগের পূর্ববর্তী রায় বাতিল করে সব অভিযোগ থেকে খালাস দেওয়া হয়। এই রায়ের ফলে, প্রায় ১৩ বছর কারাবন্দী থাকার পর গত ২৮ মে তিনি কারামুক্ত হন। এই খালাস এবং দ্রুততম সময়ে দলের নির্বাহী পরিষদের সদস্য ও পরবর্তীতে নায়েবে আমির পদে তাঁর উত্থান দলীয় রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
জামায়াতের সাংগঠনিক কৌশল ও পুনর্বাসন
দীর্ঘ কারাবাসের পর কারামুক্ত হয়ে এ টি এম আজহারুল ইসলামের মতো একজন জ্যেষ্ঠ নেতার এত অল্প সময়ে দলের সর্বোচ্চ স্তরের নেতৃত্ব পদে আসা জামায়াতে ইসলামীর সুচিন্তিত সাংগঠনিক কৌশলকেই নির্দেশ করে। কারামুক্তির পরপরই তাঁকে কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য নির্বাচিত করা হয়েছিল। এবার সরাসরি নায়েবে আমির পদে আসীন করা হলো।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াত এর মাধ্যমে দলের ভেতরের জ্যেষ্ঠ নেতাদের গুরুত্ব ও প্রতিশ্রুতির বার্তা দিতে চাইছে। একই সঙ্গে, কঠিন সময়ে যারা দলের জন্য ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তাদের সর্বোচ্চ মর্যাদা দিয়ে কর্মীদের মধ্যে উদ্দীপনা ধরে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। এই নির্বাচন জামায়াতের সাংগঠনিক শক্তি এবং নেতৃত্ব নির্বাচনের অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে নেওয়া হয়েছে।
রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রতিক্রিয়া ও প্রভাব
এ টি এম আজহারুল ইসলামের নায়েবে আমির হওয়ার ঘটনা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। একদিকে জামায়াতের নেতাকর্মীরা এটিকে দলের জন্য ইতিবাচক এবং সাংগঠনিক সাফল্যের প্রতীক হিসেবে দেখছে, অন্যদিকে অন্য রাজনৈতিক দল ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি এই বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে।
তাঁর কারামুক্তি এবং নতুন পদে নিয়োগ জামায়াতে ইসলামীকে আরও সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে ফেরাতে উৎসাহ যোগাবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। ২০২৬-২৮ মেয়াদে এই শীর্ষ পদে থাকার কারণে আগামী দিনগুলোতে দলের নীতি নির্ধারণ ও সাংগঠনিক কার্যক্রমে তাঁর প্রভাব থাকবে সুদূরপ্রসারী। জামায়াতের এই পদক্ষেপ সামগ্রিক বিরোধী রাজনীতির ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলে, তা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।
অতীত ইতিহাস ও নতুন নেতৃত্ব
এ টি এম আজহারুল ইসলাম ছাত্রজীবন থেকেই জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তাঁর বিচার হয়। এসব বিতর্কিত অতীত সত্ত্বেও জামায়াতের শীর্ষ নেতৃত্বে তাঁর আগমন সংগঠনের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নির্বাচনের ধরন এবং আদর্শিক অবস্থানের দিকটি পরিষ্কার করে।
দীর্ঘ বিরতির পর আসা এই নতুন নেতৃত্ব জামায়াতকে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কীভাবে পরিচালনা করেন, এবং বিশেষ করে দলের নিবন্ধন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে তাঁর ভূমিকা কেমন হয়, তা বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি আলোচনার বিষয় হয়ে থাকবে। নায়েবে আমির হিসেবে তিনি দলের মূলনীতি এবং কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনেন কি না, সেদিকেই সবার নজর থাকবে।
এম আর এম – ২৪১৬,Signalbd.com



