বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার গুরুতর অসুস্থতা এবং সঙ্কটাপন্ন অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি থাকাকালীন সময়ে দেশে ফেরা নিয়ে দলের নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে যে জল্পনা তৈরি হয়েছে, সে বিষয়ে মুখ খুললেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। শনিবার (২৯ নভেম্বর) বাংলাদেশ সময় সকাল পৌনে ৯টার দিকে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে তিনি মন্তব্য করেন, ‘সংকটকালে মায়ের স্নেহ–স্পর্শ পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা যেকোনো সন্তানের মতো আমারও রয়েছে।‘ তবে তিনি একই সাথে স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, এখনই দেশে ফেরার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ তাঁর জন্য ‘অবারিত ও একক নিয়ন্ত্রণাধীন নয়’। রাজনৈতিক এবং আইনি জটিলতার কারণেই এই স্পর্শকাতর বিষয়টি বিস্তারিত আলোচনার অবকাশও সীমিত বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।
মায়ের জন্য আকাঙ্ক্ষা ও আবেগের প্রকাশ
তারেক রহমান তাঁর পোস্টে মায়ের প্রতি সন্তানের তীব্র আবেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, এমন কঠিন সময়ে মায়ের পাশে থাকার তীব্র ইচ্ছা তাঁর রয়েছে। তাঁর এই মন্তব্য জিয়া পরিবারের প্রতি দলের নেতাকর্মী ও দেশবাসীর আবেগ ও সহানুভূতির প্রতিচ্ছবি। তিনি তাঁর পোস্টে লেখেন, ‘সর্বজন শ্রদ্ধেয় বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি সকলের আন্তরিক দোয়া ও ভালোবাসা প্রদর্শন করায় জিয়া পরিবারের পক্ষ থেকে সকলের প্রতি আন্তরিক ধন্যবাদ ও গভীর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি।’

তিনি বেগম খালেদা জিয়ার আশু রোগমুক্তির জন্য দলমত নির্বিশেষে দেশের সকল স্তরের নাগরিকের কাছে দোয়া অব্যাহত রাখার ঐকান্তিক অনুরোধ জানিয়েছেন। তারেক রহমানের এই আবেগঘন বার্তাটি দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে একধরনের সংহতি ও মানসিক সমর্থন যোগাবে বলে মনে করা হচ্ছে।
দেশে না ফেরার কারণ: একক নিয়ন্ত্রণাধীন নয় সিদ্ধান্ত
দেশে ফেরা নিয়ে জল্পনার জবাবে তারেক রহমান তাঁর পোস্টে রাজনৈতিক বাস্তবতার দিকটি তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, তাঁর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের বিষয়টি কোনো সাধারণ প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি ‘অন্য আর সকলের মতো এটা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আমার একক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ অবারিত ও একক নিয়ন্ত্রণাধীন নয়’। এই মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, তাঁর দেশে ফেরার সিদ্ধান্তটি কেবল ব্যক্তিগত ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে না, বরং দেশের বিদ্যমান আইনি ও রাজনৈতিক পরিবেশের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
আইনি বিশ্লেষকরা মনে করেন, তারেক রহমানের বিরুদ্ধে বাংলাদেশে একাধিক মামলায় সাজা রয়েছে। ফলে, রাজনৈতিক পট পরিবর্তন বা সরকারের পক্ষ থেকে কোনো বিশেষ সুবিধা না পেলে তাঁর পক্ষে দেশে ফেরা সম্ভব নয়। তারেক রহমান নিজেও উল্লেখ করেছেন, ‘রাজনৈতিক বাস্তবতার এই পরিস্থিতি প্রত্যাশিত পর্যায়ে উপনীত হওয়ামাত্রই স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে আমার সুদীর্ঘ উদ্বিগ্ন প্রতীক্ষার অবসান ঘটবে বলেই আমাদের পরিবার আশাবাদী।’
চিকিৎসার সর্বশেষ অবস্থা ও আন্তর্জাতিক সহায়তা
তারেক রহমান তাঁর পোস্টে বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসার সর্বশেষ পরিস্থিতি এবং এর সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন পক্ষের উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন। তিনি নিশ্চিত করেন যে, বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া গুরুতর অসুস্থ ও সঙ্কটাপন্ন অবস্থায় হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যায় রয়েছেন।
তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, ‘দেশ–বিদেশের চিকিৎসক দল বরাবরের মতো তাঁদের উচ্চমানের পেশাদারত্ব ছাড়াও সর্বোচ্চ আন্তরিক সেবা প্রদান অব্যাহত রেখেছেন।’ তিনি আরও জানান যে, বন্ধুপ্রতীম একাধিক রাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও উন্নত চিকিৎসাসহ সম্ভাব্য সকল প্রকার সহযোগিতার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করা হয়েছে। এছাড়াও, মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা তাঁর রোগমুক্তির জন্য দোয়ার পাশাপাশি চিকিৎসার সর্বতো সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এই তথ্যগুলো খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় আন্তর্জাতিক মনোযোগ এবং সংবেদনশীলতার দিকটি তুলে ধরে।
জিয়া পরিবারের পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন
তারেক রহমান তাঁর পোস্টে বেগম খালেদা জিয়ার অসুস্থতার সময়ে দলমত নির্বিশেষে সকলের পক্ষ থেকে যে আন্তরিক দোয়া ও ভালোবাসা প্রদর্শন করা হচ্ছে, তার জন্য জিয়া পরিবারের পক্ষ থেকে সকলের প্রতি আন্তরিক ধন্যবাদ ও গভীর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন।
তিনি উল্লেখ করেন যে, এই সংকটকালে দেশের সকল স্তরের নাগরিক আন্তরিকভাবে দোয়া অব্যাহত রেখেছেন। এই কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন দলের রাজনৈতিক অবস্থানকে মানবিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরার একটি প্রচেষ্টা বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এতে একদিকে যেমন দলের প্রতি জনগণের সহানুভূতি বজায় থাকবে, অন্যদিকে তেমনি নেত্রীর অসুস্থতা নিয়ে যে জাতীয় ঐক্য তৈরি হয়েছে, তাকেও সম্মান জানানো হলো।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের বক্তব্য
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের এই বক্তব্য এমন এক সময় এলো, যখন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন যে, খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা গুরুতর হওয়ায় এখনই তাঁকে বিদেশে নেওয়ার মতো স্থিতিশীলতা নেই। দলের নেতাকর্মীরা মায়ের এই চরম অসুস্থতার সময় তারেক রহমানের দেশে ফিরে নেতৃত্ব দেওয়া বা অন্তত পাশে থাকার প্রত্যাশা করছিলেন।
তারেক রহমানের পোস্টের মাধ্যমে স্পষ্ট হলো যে, তিনি ব্যক্তিগতভাবে ফিরতে চাইলেও আইনি ও রাজনৈতিক জটিলতা তাঁর সেই ইচ্ছাকে বাস্তবে রূপ দিতে বাধা দিচ্ছে। তাঁর এই বার্তা দলের অভ্যন্তরে এই বিষয়ে সৃষ্ট জল্পনা ও চাপকে কিছুটা হলেও প্রশমিত করবে। তবে একই সঙ্গে এটি বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর তাঁর নিয়ন্ত্রণহীনতার বিষয়টিকেও প্রকাশ করে।
ভবিষ্যতের প্রত্যাশা ও পরবর্তী ধাপ
তারেক রহমান তাঁর পোস্টে ভবিষ্যতের প্রতি আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তিনি প্রত্যাশা করেন, ‘রাজনৈতিক বাস্তবতার এই পরিস্থিতি প্রত্যাশিত পর্যায়ে উপনীত হওয়া মাত্রই স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে আমার সুদীর্ঘ উদ্বিগ্ন প্রতীক্ষার অবসান ঘটবে।’ এর মাধ্যমে তিনি মূলত বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশের পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত তাঁর দেশে ফেরার সম্ভাবনা নেই বলেই ইঙ্গিত দিলেন।
বর্তমানে সবার মনোযোগ বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসার দিকে। তাঁর শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল হলেই কেবল উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে বিদেশে নেওয়ার পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। তারেক রহমানের এই বার্তা জিয়া পরিবারের পক্ষ থেকে দেওয়া হলেও, সিদ্ধান্ত গ্রহণের চূড়ান্ত ক্ষমতা এখনও দেশের আইনি ও রাজনৈতিক কাঠামোর ওপরই নির্ভরশীল।
এম আর এম – ২৪১৪,Signalbd.com



