অর্থনীতি

ভারতে পচছে পেঁয়াজ, ২ রুপিতেও মিলছে না ক্রেতা

Advertisement

ভারতে পচছে পেঁয়াজ, ব্যবসায়ীদের মাথায় হাত

ভারতের বিভিন্ন পাইকারি বাজারে পেঁয়াজের দাম এমন মাত্রায় কমে গেছে যে, অনেক জায়গায় প্রতি কেজি মাত্র দুই রুপিতেও মিলছে না ক্রেতা। বিপুল পরিমাণে উৎপাদন, সরকারের বিভিন্ন সময়ে রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা, এবং বাংলাদেশের বাজার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ভারতীয় কৃষক ও ব্যবসায়ীরা অভূতপূর্ব সংকটে পড়েছেন। দিল্লির গাজিপুর পাইকারি বাজারে বস্তায় বস্তায় পেঁয়াজ পড়ে পচছে, ব্যবসায়ীরা সেগুলো সরাতেও পারছেন না।

ভারতের জনপ্রিয় সংবাদমাধ্যম ইটিভি জানিয়েছে, ২০২৫ সালের শীত মৌসুমে পেঁয়াজের দাম গত কয়েক বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। কৃষকেরা উৎপাদন খরচ তুলতে পারছেন না, আর ব্যবসায়ীরা পণ্য ধরে রাখার জায়গা পাচ্ছেন না।

বাংলাদেশে রপ্তানি বন্ধ: ভারতীয় বাজার ধসে পড়ার প্রধান কারণ

ভারত বহু বছর ধরে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান পেঁয়াজ সরবরাহকারী দেশ। বছরের নির্দিষ্ট সময়ে বাংলাদেশে উৎপাদন কম থাকায় আমদানির ওপর গুরুত্ব বেড়ে যেত। কিন্তু গত দুই বছর ধরে বাংলাদেশ নিজস্ব উৎপাদন বাড়িয়েছে এবং স্থানীয় কৃষকের সুরক্ষায় ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি স্থগিত রেখেছে।

এতে ভারতের রপ্তানি বাজার বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে।

পণ্য রপ্তানি ও বৈদেশিক বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ লোকেশ গুপ্ত বলেছেন,
“বাংলাদেশ বহু বছর ধরে ভারতের মোট পেঁয়াজ রপ্তানির এক-তৃতীয়াংশ কিনতো। কিন্তু এখন বাংলাদেশ নিজেদের উৎপাদন বাড়িয়েছে। ফলে ভারতের ওপর নির্ভরতা কমেছে।”

বাংলাদেশের বাজার বন্ধ হওয়ায় নাসিক, আলওয়ার, মধ্যপ্রদেশ ও কর্ণাটক—যেখানে পেঁয়াজের চাষ সবচেয়ে বেশি—সেসব এলাকার কৃষকেরা বিপাকে পড়েছেন।

ভারতীয় ব্যবসায়ীদের ভাষায়, বাংলাদেশ বাজার হারানো মানেই পেঁয়াজের দাম অর্ধেকে নেমে যাওয়া। ঠিক সেটাই ঘটেছে ২০২৫ সালের শীত মৌসুমে।

গাজিপুর পাইকারি বাজারের দৃশ্য: দুই রুপির পেঁয়াজও ফেলে দিচ্ছে মানুষ

দিল্লির গাজিপুর হলো ভারতের অন্যতম বড় পাইকারি বাজার। এখানকার ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, পেঁয়াজ কিনে লাভ তো দূরের কথা, নিজের পরিবহন খরচও উঠছে না।

গাজিপুরের ব্যবসায়ী পারমানন্দ সাইনি বলেন,
“নাসিক, বেঙ্গালুরু, আলওয়ার সব জায়গা থেকে প্রচুর পেঁয়াজ এসেছে। ফলনও ভালো। কিন্তু রপ্তানি বন্ধ থাকায় প্রতি কেজি মাত্র দুই থেকে সর্বোচ্চ ১৩ রুপিতে বিক্রি হচ্ছে। এতে কেউ লাভ করতে পারছে না।”

তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন,
“৫০ কেজি ছোট পেঁয়াজের একটি বস্তার দাম মাত্র ১০০ রুপি। ওপর থেকে শ্রমিক খরচ, পরিবহন খরচ, কমিশন—মোট ব্যয় দাঁড়ায় ১২০ রুপি। এতে কৃষকের উৎপাদন খরচও ওঠে না।”

অন্য ব্যবসায়ী সচ্ছা সিং জানান,
“এ সময় সরকার আগের মজুত পেঁয়াজ বাজারে ছাড়ছে। উৎপাদন যখন সবচেয়ে বেশি, ঠিক তখনই সরকারি সংস্থাগুলো আগের স্টক বাজারে নামানোয় দাম আরও কমে যাচ্ছে।”

আরও বড় সমস্যা হলো সংরক্ষণ। কোনো কোনো বাজারে এত পেঁয়াজ জমে আছে যে, জায়গা সংকুলান না হওয়ায় রোদ-বৃষ্টিতে পড়ে পচে যাচ্ছে।

অতিরিক্ত উৎপাদন না আশীর্বাদ, বরং অভিশাপ

২০২৫ সালে ভারতের প্রধান পেঁয়াজ উৎপাদন অঞ্চলগুলোতে বৃষ্টিপাত সময়মতো হওয়ায় ফলন ভালো হয়েছে। সাধারণত এই ভালো উৎপাদনই কৃষকের মুখে হাসি ফোটায়। কিন্তু এবার হয়েছে উল্টো।

কারণ তিনটি:

  1. রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা ও উচ্চ শুল্ক
    ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ভারত সরকার কয়েক দফায় রপ্তানি বন্ধ, শুল্ক আরোপ, নীতি পরিবর্তনের মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এতে বিদেশি বাজারে ভারতের অবস্থান দুর্বল হয়।
  2. বাংলাদেশ বাজার বন্ধ
    ভোক্তা সাধারণের দামের স্থিতিশীলতার জন্য বাংলাদেশ স্থানীয় উৎপাদনে জোর দিয়ে ভারতীয় পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ করে দেয়।
  3. বিদেশি প্রতিযোগী দেশের উত্থান
    সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া—আগে এশিয়ার অনেক দেশ ভারত থেকেই পেঁয়াজ কিনত। এখন ইয়েমেন, ইরান, তুরস্ক, মিসর এবং পাকিস্তানও বড় সরবরাহকারী হয়ে উঠেছে। ফলে ভারত আগের চাহিদা হারাচ্ছে।

অবৈধভাবে বীজ রপ্তানির ফলে ভারত হারাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী বাজার

ভারতীয় ব্যবসায়ীরা জানান, গত কয়েক বছরে ভারতের কিছু উন্নতমানের পেঁয়াজ বীজ অবৈধভাবে বিদেশে পাচার হয়েছে। এতে বাংলাদেশ, নেপাল, মিয়ানমার ও শ্রীলঙ্কা নিজেদের উৎপাদন বাড়াতে পেরেছে।

এর ফলে এসব দেশ ভারতের ওপর নির্ভরতা কমিয়েছে। আগে যেসব দেশ ভারতের বেগুনী নাসিক পেঁয়াজ বা বেল্লারি পেঁয়াজ নিয়মিত আমদানি করত, এখন তারা নিজেরাই উৎপাদনের দিকে ঝুঁকছে।

ভারতের ব্যবসায়ীদের মতে,
“বীজ পাচার না হলে অনেক দেশ এখনো ভারতীয় পেঁয়াজের ওপর নির্ভরশীল থাকতো।”

এক বছরে ভারতীয় পেঁয়াজ শিল্প কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হলো

ভারতে বছরে প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ টন পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ রপ্তানি হতো। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে রপ্তানি প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল। ফলে অন্তত ৪০ থেকে ৫০ লাখ টন পেঁয়াজ দেশেই জমে গেছে—যার বড় অংশ সংরক্ষণ করা যায়নি।

এতে কয়েকটি বড় ক্ষতি হয়েছে:

১. কৃষকের লোকসান বেড়েছে

যেখানে প্রতি কেজি পেঁয়াজ উৎপাদনে কৃষকের খরচ ১০–১২ রুপি, সেখানে বাজারে দাম নেমে এসেছে ২–৫ রুপিতে।

২. সংরক্ষণ ব্যয় বেড়েছে

মজুত রাখতে গেলে ব্যবসায়ীদের বাড়তি টাকা খরচ করতে হচ্ছে। কিন্তু কম দামের কারণে সেই ব্যয় আর ওঠে না।

৩. বিদেশি বাজার হারিয়েছে ভারত

ভারত যখন রপ্তানি নিষিদ্ধ রাখল, তখন অন্য দেশগুলো সেই বাজার দখল করে নেয়। এরপর ভারত আবার বাজারে ফিরতে চাইলে আগের ক্রেতারা আগ্রহ দেখায়নি।

বাংলাদেশ কেন আমদানি বন্ধ রাখল

বাংলাদেশ ২০২৩ সালে পেঁয়াজের দাম বাড়ার পর থেকে অভ্যন্তরীণ উৎপাদনে জোর দেয়। কৃষকদের প্রণোদনা, আধুনিক বীজ ও কৃষি সম্প্রসারণ প্রকল্প—এসবের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ে।

বাংলাদেশ সরকার বাজার স্থিতিশীল রাখতে আমদানি অনেক কমিয়ে দেয়, যাতে কৃষকের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা যায়।

বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানায়,
“যখন স্থানীয় বাজারে পর্যাপ্ত উৎপাদন থাকে, তখন ভারত থেকে আমদানির প্রয়োজন নেই। অতিরিক্ত আমদানি স্থানীয় কৃষকের ক্ষতি করে।”

ফলে ভারতীয় পেঁয়াজের সবচেয়ে বড় বাজারটি প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।

সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলো ভারতকে কেন এড়িয়ে যাচ্ছে

সৌদি আরব জানিয়েছে, তারা ইয়েমেন ও ইরান থেকে কম দামে পেঁয়াজ পাচ্ছে। ভারত থেকে আমদানি করলে দাম তুলনামূলক বেশি পড়ে, কারণ ভারত অতীতে হঠাৎ রপ্তানি নিষিদ্ধ করত। উপসাগরীয় দেশগুলো এমন অনিশ্চয়তা পছন্দ করে না।

এতে ভারতের রপ্তানি বাজার আরও সংকুচিত হয়েছে।

বাজার বাঁচাতে কী করা উচিত—বিশেষজ্ঞদের মত

ভারতীয় অর্থনীতিবিদ, বিপণন বিশেষজ্ঞ ও কৃষি সংগঠনগুলো সরকারের কাছে কয়েকটি প্রস্তাব তুলেছে—

১. রপ্তানি নীতি দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল করতে হবে

যেন হঠাৎ নিষেধাজ্ঞা না আসে। ক্রেতা দেশগুলো দীর্ঘমেয়াদি আস্থায় বিনিয়োগ করতে পারে।

২. সরকারি সংস্থা NAFED-এর বিদেশে শাখা খোলা

যাতে বিদেশি বাজারে সরাসরি ভারতীয় কৃষকের পণ্য পৌঁছানো যায়।

৩. পেঁয়াজ রপ্তানি বাজারকে বহুমুখী করা

শ্রীলংকা, নেপাল, ভুটান ছাড়াও আফ্রিকার কয়েকটি দেশ—যেমন কেনিয়া, তানজানিয়া, নাইজেরিয়া—বড় বাজার হতে পারে।

৪. সরকারি মজুতসীমা নির্ধারণ

যাতে অনিয়ন্ত্রিত স্টক ডাম্প করে দাম ভেঙে না দেওয়া হয়।

৫. কৃষকের জন্য ন্যূনতম মূল্য নিশ্চিত করা

যাতে উৎপাদন খরচের নিচে দাম না পড়ে।

ভবিষ্যতে মূল্য স্থিতিশীল হবে কি না

ভারতের বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ এবং রপ্তানি না থাকায় দাম আরও কমে ১–২ রুপিতে নামতে পারে।

তবে ফেব্রুয়ারি-মার্চের দিকে বাজার কিছুটা স্থিতিশীল হতে পারে।

বাংলাদেশ আগামী রমজানে আমদানি চালু করলে ভারতের বাজার ঘুরে দাঁড়াতে পারে—এমন আশা রয়েছে ব্যবসায়ীদের মধ্যে।

সংক্ষেপে বর্তমান পরিস্থিতি

  • ভারতে পেঁয়াজের দাম কমে প্রতি কেজি ২ রুপিতে দাঁড়িয়েছে
  • বাংলাদেশের বাজার বন্ধ, ফলে রপ্তানি কার্যত শূন্য
  • উৎপাদন বেশি, সংরক্ষণ কম—বস্তায় বস্তায় পেঁয়াজ পচছে
  • কৃষকের উৎপাদন খরচ তুলতে পারছেন না
  • বিদেশি বাজার দখল করেছে অন্য দেশগুলো
  • ভারতীয় ব্যবসায়ীদের দাবি, স্থিতিশীল রপ্তানি নীতি ছাড়া এই সংকট কাটবে না

দুই বছর ধরে ধারাবাহিক নিষেধাজ্ঞা, শুল্ক, রপ্তানি বন্ধ—সব মিলিয়ে ভারতীয় পেঁয়াজ শিল্প ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়েছে। এই ক্ষতির কেন্দ্রে রয়েছে তিনটি বড় কারণ—বাংলাদেশে রপ্তানি বন্ধ, বিদেশি বাজারে প্রতিযোগী দেশের উত্থান এবং সরকারের অস্থির নীতি। কৃষক, ব্যবসায়ী, পাইকার—কেউই এই ক্ষতির বাইরে নয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারত যদি দ্রুত রপ্তানি নীতি স্থিতিশীল না করে এবং বাজার বৈচিত্র্য না আনে, তবে কৃষকেরা চাষ কমিয়ে দেবে। এতে ভবিষ্যতে আবারও পেঁয়াজ সংকট দেখা দিতে পারে—যার প্রভাব পড়বে ভারতের পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশগুলোতেও।

MAH – 14048 I Signalbd.com

মন্তব্য করুন
Advertisement

Related Articles

Back to top button