‘খালেদা জিয়ার জন্য প্রস্তুত এয়ার অ্যাম্বুলেন্স, শারীরিক অবস্থা বুঝে নেয়া হবে সিদ্ধান্ত’
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন হলে দ্রুত বিদেশে নেওয়ার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। দলের ভাইস চেয়ারম্যান আহমেদ আযম খান শনিবার (২৯ নভেম্বর) দুপুরে এভারকেয়ার হাসপাতালের সামনে সাংবাদিকদের এই তথ্য জানান। তিনি বলেন, চিকিৎসকরা নিবিড় পর্যবেক্ষণ করছেন এবং বিদেশে নেওয়ার মতো শারীরিক অবস্থা তৈরি হলেই কেবল এয়ার অ্যাম্বুলেন্স ব্যবস্থা কার্যকর করা হবে।
ফুসফুসে সংক্রমণ ও হৃদযন্ত্রের জটিলতাসহ নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন প্রায় ৮০ বছর বয়সী এই নেত্রী। গত ২৩ নভেম্বর তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে তিনি সিসিইউতে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত মেডিকেল বোর্ডের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছেন। তাঁর শারীরিক অবস্থার স্থিতিশীলতা আসার ওপরই নির্ভর করছে পরবর্তী চিকিৎসা সংক্রান্ত সকল সিদ্ধান্ত।
সিসিইউতে নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও বিদেশে নেওয়ার প্রস্তুতি
বিএনপি ভাইস চেয়ারম্যান আহমেদ আযম খান সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে খালেদা জিয়ার বর্তমান শারীরিক অবস্থা এবং দলের পক্ষ থেকে নেওয়া প্রস্তুতির বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি নিশ্চিত করেন যে, বেগম জিয়া বর্তমানে এভারকেয়ার হাসপাতালের সিসিইউতে (Coronary Care Unit) চিকিৎসাধীন আছেন। দেশি ও বিদেশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্বয়ে গঠিত মেডিকেল বোর্ডের সদস্যরা নিয়মিত তাঁর শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছেন।
আযম খান বলেন, বিদেশে উন্নত চিকিৎসার জন্য দলের পক্ষ থেকে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। বিদেশের একাধিক খ্যাতনামা হাসপাতালের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ চলছে এবং চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় এয়ার অ্যাম্বুলেন্সও প্রস্তুত রাখা হয়েছে। তবে, বিদেশে নেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করছে মেডিকেল বোর্ডের মতামতের ওপর। চিকিৎসকরা মনে করছেন, বর্তমান সংকটাপন্ন অবস্থায় দীর্ঘ পথ ভ্রমণের ধকল নেওয়ার মতো শারীরিক স্থিতিশীলতা এখনও আসেনি। শারীরিক অবস্থা অনুকূল ও স্থিতিশীল হলেই তাঁকে দ্রুত বিদেশে নেওয়া হবে।
সংকটাপন্ন অবস্থা: হৃদযন্ত্র ও ফুসফুসের জটিলতা
গত ২৩ নভেম্বর বেগম খালেদা জিয়াকে হাসপাতালে ভর্তি করার কারণ হিসেবে ফুসফুসে সংক্রমণ এবং হৃদযন্ত্রের গুরুতর জটিলতার কথা উল্লেখ করা হয়। তিনি দীর্ঘদিন ধরেই আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিস, কিডনি ও লিভারের জটিলতাসহ বিভিন্ন রোগে ভুগছেন। সাম্প্রতিক জটিলতা তাঁর শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটিয়েছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, মেডিকেল বোর্ড নিবিড়ভাবে তাঁর হৃদযন্ত্রের কার্যকারিতা ও ফুসফুসের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছেন। জাতীয় নাগরিক পার্টির তিন সদস্যের প্রতিনিধি দল হাসপাতাল পরিদর্শনের পর জানান, অবস্থা সংকটাপন্ন হলেও তিনি সজাগ আছেন এবং চিকিৎসকদের নির্দেশনা বুঝতে পারছেন। অন্যদিকে, বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন জানিয়েছেন, বেগম জিয়ার অবস্থা এখনো অপরিবর্তিত। চিকিৎসা এবং বিদেশে নেওয়ার বিষয়ে সকল সিদ্ধান্ত মেডিকেল বোর্ড নেবে।
রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে উদ্বেগ
বেগম খালেদা জিয়ার এই অসুস্থতা দেশের রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং দেশবাসীর কাছে তাঁর রোগমুক্তি কামনায় দোয়া চেয়েছেন।
এছাড়াও, প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসও তাঁর স্বাস্থ্যের অবস্থা নিয়ে গভীর উদ্বেগ জানিয়েছেন এবং নিয়মিত খোঁজ রাখছেন। প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশে প্রয়োজনীয় সব চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। শুক্রবার রাতে প্রধান উপদেষ্টার আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল ও বিশেষ সহকারী মনির হায়দার হাসপাতালে গিয়ে খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে তথ্য নেন। এই উচ্চ পর্যায়ের খোঁজখবর নেওয়া দেশের রাজনৈতিক পরিবেশের সংবেদনশীলতাকেই তুলে ধরে।
মতামত ও পরবর্তী পদক্ষেপ
খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা বিদেশে নিয়ে যাওয়ার অনুকূলে আছে কিনা, তা নিয়ে চিকিৎসক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের মধ্যে ভিন্নমত দেখা যাচ্ছে। নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, বর্তমান শারীরিক অবস্থায় তাঁকে বিদেশে নেওয়া সম্ভব নয়; পরিস্থিতি আরও স্থিতিশীল হওয়া প্রয়োজন। এই মতামতের সঙ্গে মেডিকেল বোর্ডের প্রাথমিক মূল্যায়নের মিল রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, হৃদযন্ত্র এবং ফুসফুসের সংক্রমণের মতো জটিলতা নিয়ে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। সেক্ষেত্রে, আগে সিসিইউতে নিবিড় চিকিৎসার মাধ্যমে তাঁর ভাইটাল সাইনগুলো (vital signs) স্থিতিশীল করা জরুরি। মেডিকেল বোর্ডের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, দ্রুত সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করে তাঁকে ভ্রমণের জন্য উপযুক্ত করে তোলা।
হাসপাতাল পরিদর্শন ও দোয়া প্রার্থনা
শনিবার সকালে খালেদা জিয়ার খোঁজখবর নিতে হাসপাতালে ছুটে যান ডাকসুর সাবেক এজিএস ও বিএনপি নেতা নাজিমুদ্দিন আলম। তিনি বাইরে এসে সাংবাদিকদের কাছে দলের নেত্রীর আশু সুস্থতার জন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া কামনা করেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা ও সামাজিক ব্যক্তিবর্গ হাসপাতালে এসে বা ফোন করে তাঁর চিকিৎসার খোঁজ নিচ্ছেন। এটি কেবল একজন রাজনৈতিক নেত্রীর অসুস্থতা নয়, বরং দেশের একটি বড় অংশের মানুষের আবেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভবিষ্যতের সম্ভাব্য পথরেখা
মেডিকেল বোর্ডের পরবর্তী ঘোষণার ওপরই নির্ভর করছে বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসার ভবিষ্যতের গতিপথ। যদি তাঁর শারীরিক অবস্থা ভ্রমণের জন্য উপযোগী না হয়, তবে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত বোর্ড দেশেই সর্বোচ্চ চিকিৎসা চালিয়ে যাবেন। আর যদি অবস্থার সামান্য উন্নতি ঘটে এবং বোর্ড বিদেশে নেওয়ার জন্য সম্মতি দেন, তবে দ্রুতই তাঁকে প্রস্তুত রাখা এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে বিদেশে নিয়ে যাওয়া হতে পারে। তবে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলের নেত্রীর স্বাস্থ্যের এই নাজুক পরিস্থিতি দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক ধরনের চাপা উত্তেজনা বজায় রেখেছে।
“বিদেশের বিভিন্ন হাসপাতালের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ চলছে। এয়ার অ্যাম্বুলেন্সও প্রস্তুত রাখা হয়েছে। শারীরিক অবস্থা অনুকূলে এলেই তাকে বিদেশে নেওয়া হবে।” — আহমেদ আযম খান
এম আর এম – ২৪০৭,Signalbd.com



