আঞ্চলিক

লন্ডনের প্রেসক্রিপশনে বাংলাদেশ চলবে না: ভিপি সাদিক কায়েম

Advertisement

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি আবু সাদিক কায়েম বলেছেন, লন্ডন থেকে প্রেসক্রিপশন দিয়ে বা বিদেশনির্ভর সিদ্ধান্তে বাংলাদেশ পরিচালিত হবে না। তিনি দৃঢ়তার সাথে মন্তব্য করেন যে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ দেশের জনগণ এবং গণতান্ত্রিক চর্চার ভিত্তিতেই নির্ধারিত হবে। শনিবার (২৯ নভেম্বর) দুপুরে সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় এক ছাত্র ও যুব সমাবেশে অংশ নিয়ে তিনি এই হুঁশিয়ারি দেন। তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, জনগণের বাংলাদেশে বস্তাপচা রাজনীতি ও ফ্যাসিবাদী কাঠামোর আর কোনো সুযোগ নেই।

সিলেটের স্থানীয় ছাত্র ও যুবকদের অংশগ্রহণে আয়োজিত এই সমাবেশে ভিপি সাদিক কায়েম দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, তরুণ সমাজের আকাঙ্ক্ষা এবং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের স্বরূপ নিয়ে বিস্তারিত বক্তব্য রাখেন। তাঁর এই বক্তব্য দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিদেশী প্রভাব এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের গুরুত্ব নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।

লন্ডনের প্রেসক্রিপশন কেন অচল: ভিপি কায়েমের বিশ্লেষণ

ভিপি সাদিক কায়েম তার বক্তৃতায় দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশী হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করে সুস্পষ্ট অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘লন্ডন থেকে প্রেসক্রিপশন দিয়ে কেউ দেশ চালাতে পারবে না। বাংলাদেশ পরিচালনা করতে হলে দেশের মাটি ও মানুষের নেতা হতে হবে।’ তিনি মনে করেন, একজন নেতাকে অবশ্যই দেশের সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে, তাদের সমস্যা ও আকাঙ্ক্ষা বুঝে যোগ্যতা ও কাজের মাধ্যমে নিজেকে প্রমাণ করতে হবে।

সাদিক কায়েম দাবি করেন, দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন জনগণের ইচ্ছা এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই হওয়া উচিত। তিনি উল্লেখ করেন, ‘বাংলাদেশ চলবে দেশের মানুষের প্রত্যাশার ও শহীদদের আকাঙ্ক্ষার আলোকে।’ কোনো একক শক্তি বা দূরবর্তী কোনো দেশ থেকে পরিচালিত নির্দেশনায় এ দেশের জনগণ আর চলতে প্রস্তুত নয়। তিনি আরও বলেন, ‘লন্ডন থেকে কেউ প্রেসক্রিপশন দিয়েও বাংলাদেশ পরিচালনা করতে পারবে না।’ এটি কেবল ভৌগোলিক দূরত্বের বিষয় নয়, বরং দেশের সার্বভৌমত্ব ও আত্মমর্যাদার প্রশ্ন।

ফ্যাসিবাদী কাঠামোর বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি

ডাকসু ভিপি দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং ভবিষ্যতে কোনো প্রকার ফ্যাসিবাদী শাসনের উত্থানের সম্ভাবনা নিয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি দেন। তিনি বলেন, ‘নতুন বাংলাদেশে কোনো ফ্যাসিবাদী কাঠামো চলবে না, এটা হবে জনগণের বাংলাদেশ।’ তিনি মনে করেন, অতীতের জুলুম-নির্যাতন এবং একনায়কতান্ত্রিক মনোভাবের পুনরাবৃত্তি দেশের তরুণ সমাজ আর মেনে নেবে না।

তিনি আরও স্পষ্ট করে বলেন, কেউ যদি ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে, তবে তার পরিণতি শেখ হাসিনার চেয়েও ভয়াবহ হবে। তিনি দাবি করেন, বিগত সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে একটি দলের ‘লাঠিয়াল’ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, যা নতুন বাংলাদেশে আর চলতে দেওয়া হবে না। তিনি দৃঢ়তার সাথে বলেন, নতুন বাংলাদেশে ক্ষমতা থাকবে জনগণের হাতে, এবং জনগণের সিদ্ধান্তের মাধ্যমেই আগামীর বাংলাদেশ পরিচালিত হবে। জনগণের অধিকার হরণ করার যেকোনো প্রচেষ্টা কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে।

তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা ও জুলাই বিপ্লব

ভিপি সাদিক কায়েম দেশের তরুণ সমাজের রাজনৈতিক চেতনা ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার কথা তুলে ধরেন। তিনি সাম্প্রতিক সময়ের গণআন্দোলনকে ‘জুলাই বিপ্লব’ হিসেবে অভিহিত করেন এবং বলেন, এই বিপ্লবের মাধ্যমে একটি নতুন প্রজন্ম তৈরি হয়েছে, যারা ন্যায়বিচার (ইনসাফ) ও পরিবর্তনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

তিনি বলেন, তরুণদের আকাঙ্ক্ষা-প্রত্যাশার আলোকেই নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণ হবে। তিনি দাবি করেন, দেশের তরুণরা ইতোমধ্যে ইনসাফের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে এবং অতীতে ডাকসু, রাকসু, জাকসু ও চাকসু-এর মতো ছাত্র সংসদগুলোতে ইনসাফের প্রতিনিধিরা বিজয়ী হয়েছে। ভিপি কায়েম আশা প্রকাশ করেন, আসন্ন নির্বাচনে ইনসাফের প্রতিনিধিরা দেশের প্রতিটি আসনে জনগণের ‘ভূমিধস ম্যান্ডেড’ পেয়ে বিজয়ী হবে এবং জনগণের ক্ষমতা জনগণের হাতে ফিরিয়ে দেবে। তরুণদের এই রাজনৈতিক সচেতনতা দেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে তিনি মনে করেন।

‘দিল্লির দালালি’ এবং সীমান্ত হত্যার বিচার

লন্ডনের পাশাপাশি দেশের রাজনীতিতে আরেক প্রতিবেশী দেশের প্রভাব নিয়েও তিনি কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘অতীতে ভারত আমাদের অনেক জুলুম-নির্যাতন করেছে। ফ্যাসিস্টরা দিল্লির দালালিকে প্রশ্রয় দিয়েছিল। এ স্বাধীন বাংলাদেশে আর দিল্লির দালালি চলবে না।’ তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রতিবেশী দেশের অতিরিক্ত প্রভাব দেশের স্বার্থের পরিপন্থী। তিনি স্পষ্ট করে দেন, ‘ভারতের প্রেসক্রিপশনে আর বাংলাদেশ চলবে না।’

এছাড়াও, তিনি সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হাতে বাংলাদেশি নাগরিক হত্যার বিষয়টি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি ঘোষণা করেন, ‘আর সীমান্তে হত্যা চলবে না। সীমান্তে যদি একটি লাশ পড়ে তাহলে ১৮ কোটি জনগণ একসঙ্গে প্রতিবাদ-প্রতিরোধে নামবে।’ তিনি দাবি করেন, বিগত সময়ের প্রতিটি সীমান্ত হত্যার বিচার করা হবে। এই বক্তব্য দেশের সার্বভৌমত্ব, আত্মমর্যাদা এবং নাগরিক সুরক্ষার প্রতি তাঁর দলের কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত বহন করে।

খালেদা জিয়ার আরোগ্য কামনা এবং সমাবেশ

সমাবেশের শেষ পর্যায়ে ভিপি সাদিক কায়েম বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার গুরুতর অসুস্থতার বিষয়টি উল্লেখ করেন এবং মহান আল্লাহ্‌র দরবারে তার আশু রোগমুক্তি কামনায় দোয়া ও মোনাজাত করেন। এই দোয়া রাজনৈতিক সংহতি এবং দেশের প্রবীণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের প্রতি তাঁর সম্মান প্রদর্শন করে।

উল্লেখ্য, এই ছাত্র ও যুব সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন সিলেট-৪ আসনের জামায়াতে ইসলামী মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী জয়নাল আবেদীন। স্থানীয় ছাত্র ও যুব নেতারাও সমাবেশে বক্তব্য প্রদান করেন। এই আয়োজনটি মূলত দেশের যুব ও ছাত্র সমাজের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিবর্তনের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যেই অনুষ্ঠিত হয়।

বিশ্লেষকদের দৃষ্টিকোণ ও রাজনৈতিক প্রভাব

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েমের এই বক্তব্য দেশের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে জমে থাকা ক্ষোভ ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। ‘লন্ডনের প্রেসক্রিপশন’ বা ‘দিল্লির দালালি’র বিরোধিতা করে তিনি মূলত একটি জন-কেন্দ্রিক, দেশপ্রেমমূলক এবং সার্বভৌমত্বের প্রতি জোর দেওয়া রাজনীতির বার্তা দিতে চেয়েছেন। বিশেষত, যখন দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিদেশী শক্তিগুলোর ভূমিকা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন রয়েছে, তখন তাঁর এই ধরনের বক্তব্য তরুণদের মধ্যে ব্যাপক সমর্থন পেতে পারে। তাঁর ‘জুলাই বিপ্লব’ এবং ‘ইনসাফ’-এর পক্ষে অবস্থানের ঘোষণা ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের রাজনীতিতে তরুণদের একটি স্বতন্ত্র ধারা তৈরি করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

এম আর এম – ২৪০৬,Signalbd.com

মন্তব্য করুন
Advertisement

Related Articles

Back to top button