অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের আজ শনিবার (২৯ নভেম্বর) একটি বিশেষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে দেশসেবা, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা এবং বৈদেশিক অনুদান সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এছাড়াও বিএনপি চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দ্রুত সুস্থতা কামনায় দোয়া ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়েছে।
খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনায় বিশেষ মোনাজাত
সভায় ধর্ম বিষয়ক উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন দোয়া পরিচালনা করেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত সকল উপদেষ্টা ও কর্মকর্তা খালেদা জিয়ার দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতা কামনা করেন। বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, “সভার শুরুতেই মাননীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দ্রুত আরোগ্য কামনায় বিশেষ মোনাজাত করা হয়।”
খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যগত অবস্থা নিয়ে রাজনৈতিক এবং সামাজিক মহলে উদ্বেগ থাকলেও আজকের বিশেষ দোয়া অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আশা প্রকাশ করা হয় যে তিনি শীঘ্রই সুস্থ হয়ে আবার দেশ ও জনসেবায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হবেন।
বৈদেশিক অনুদান অধ্যাদেশে নতুন সংশোধনী
সভায় বৈদেশিক অনুদান (স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম) রেগুলেশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ খসড়া নীতিগত ও চূড়ান্তভাবে অনুমোদিত হয়েছে। এই সংশোধনের ফলে বর্তমান আইন ও বিধিমালায় বেশ কিছু পরিবর্তন এসেছে।
সংশোধনের মূল বিষয়গুলো হলো:
- এনজিও নিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজীকরণ: আগের চেয়ে কম জটিলতার মাধ্যমে এনজিও নিবন্ধন সম্পন্ন করা যাবে।
- অনুদান অবমুক্তির শর্তে সরলীকরণ: বিদেশ থেকে যে কোনো তহবিল দেশের স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রমে আসে, তার অনুমোদনের প্রক্রিয়া সহজ করা হয়েছে।
- স্বয়ংক্রিয় অনুমোদন সীমা: বছরে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত অনুদানের ক্ষেত্রে আর অতিরিক্ত অনুমোদনের প্রয়োজন হবে না।
- আইনটি আরও অংশীজন বান্ধব: স্বেচ্ছাসেবামূলক সংস্থাগুলোর জন্য আইনটি আরও সুবিধাজনক ও কার্যকরী করা হয়েছে।
এতে দেশের এনজিও খাতের কার্যক্রম আরও স্বচ্ছ, দায়িত্বশীল ও দ্রুতগতিশীল হবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়েছে।
পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশের খসড়া উত্থাপন
সভায় পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫ খসড়া প্রথমবারের মতো উত্থাপিত হয়। উপদেষ্টা পরিষদ অধ্যাদেশটি আরও বিস্তারিতভাবে এবং সংশোধিত আকারে পরবর্তী সভায় উত্থাপনের নির্দেশ দিয়েছে।
পুলিশ কমিশন সংক্রান্ত এই অধ্যাদেশ দেশের পুলিশ বাহিনীর স্বচ্ছতা, দায়িত্বশীলতা ও জনসেবা নিশ্চিত করতে সহায়ক হিসেবে কাজ করবে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও জনসাধারণের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি এবং পুলিশ বাহিনীর ক্ষমতা ও দায়িত্বের মধ্যে সুস্পষ্ট সীমা নির্ধারণের জন্য এই অধ্যাদেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
প্রবাসীদের দ্রুত মুক্তি সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত
সভায় প্রবাসী কল্যাণ উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল উপদেষ্টা পরিষদকে অবহিত করেন, যে আরব আমিরাতে জুলাই মাসে অনুষ্ঠিত গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নেয়ার অভিযোগে বন্দী থাকা অবশিষ্ট ২৪ জন প্রবাসী বাংলাদেশে অচিরেই ফিরবেন। তিনি জানান, “দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে তারা দেশে পৌঁছাবেন।”
এ বিষয়ে উপদেষ্টা পরিষদ এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে। প্রবাসীদের দ্রুত ও নিরাপদ প্রত্যাবর্তন দেশের জন্য ইতিবাচক একটি সংবাদ বলে অভিহিত করা হয়েছে।
সভার সারসংক্ষেপ
আজকের বিশেষ সভার মূল বিষয়গুলো সংক্ষেপে নিম্নরূপ:
- খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনায় দোয়া ও মোনাজাত।
- বৈদেশিক অনুদান অধ্যাদেশে গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী গ্রহণ।
- পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ খসড়া পরবর্তী সভায় উত্থাপনের জন্য অনুমোদন।
- প্রবাসী কল্যাণ বিষয়ক ২৪ জন প্রবাসীর দ্রুত মুক্তি।
উপদেষ্টা পরিষদে উপস্থিত ছিলেন সরকারের বিভিন্ন খাতের উপদেষ্টা, বিশেষজ্ঞ, এবং কর্মকর্তাগণ। তারা সকলেই দেশের উন্নয়ন, জনসেবা, আইনশৃঙ্খলা ও বৈদেশিক সম্পর্ককে আরও মজবুত করার বিষয়ে একমত পোষণ করেন।
বৈদেশিক অনুদান খাতে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি
বাংলাদেশে এনজিও খাতের গুরুত্ব দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। স্বেচ্ছাসেবামূলক সংস্থাগুলি স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নারী-শিশু উন্নয়ন, গ্রামীণ উন্নয়ন ও দুর্যোগ মোকাবেলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বৈদেশিক অনুদান সংশোধনের মাধ্যমে সরকারের লক্ষ্য হলো:
- স্বচ্ছতা বৃদ্ধি: অনুদান ব্যবহারে জালিয়াতি ও দুর্নীতি রোধ।
- কার্যক্রমের দ্রুততা: ছোটখাটো অনুদান অনুমোদনের জটিলতা কমানো।
- স্থানীয় অংশগ্রহণ: স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবামূলক সংস্থার কার্যক্রম সহজ করা।
পুলিশ কমিশন ও জনসেবা
পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ দেশের পুলিশ বাহিনীকে আরও শক্তিশালী, দায়িত্বশীল এবং জনগণকেন্দ্রিক করার লক্ষ্য নিয়ে তৈরি করা হচ্ছে। অধ্যাদেশটি:
- পুলিশ বাহিনীর দায়িত্ব ও কর্তৃত্ব সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করবে।
- পুলিশের মধ্যে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে।
- জনসাধারণের সঙ্গে পুলিশি সম্পর্ক উন্নত করবে।
প্রবাসীদের মুক্তি: মানবিক ও কূটনৈতিক দিক
প্রবাসীদের দ্রুত মুক্তি ও দেশে প্রত্যাবর্তন মানবিক এবং কূটনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এটি প্রবাসীদের নিরাপত্তা ও তাদের অধিকার নিশ্চিত করতে সহায়ক। এছাড়াও, এটি দেশের ইমেজ ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
উপদেষ্টা পরিষদের আজকের বিশেষ বৈঠকটি দেশের রাজনৈতিক, প্রশাসনিক এবং সামাজিক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের এক গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। খালেদা জিয়ার সুস্থতার জন্য দোয়া, বৈদেশিক অনুদান ও পুলিশ কমিশন সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত, এবং প্রবাসীদের দ্রুত মুক্তি—all এই পদক্ষেপ দেশের উন্নয়ন, শান্তি এবং মানবিক মূল্যবোধের প্রতি সরকারের অঙ্গীকারকে তুলে ধরে।
আজকের সভা প্রমাণ করেছে যে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ শুধু নীতিনির্ধারণী নয়, বরং দেশের জনগণের কল্যাণ ও মানবিক উন্নয়নের জন্য কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণেও সক্রিয়।
MAH – 14045 I Signalbd.com



