বাংলাদেশ

ইসলাম মোড়কে বাউল দর্শন ও আচারের প্রতারণা বন্ধের আহ্বান ৩৭১ শিক্ষকের

Advertisement

বাংলাদেশের ৩৭১ জন বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজের শিক্ষক এক যৌথ বিবৃতিতে ইসলাম মোড়কে বাউল দর্শন ও আচারের প্রতারণা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন। তারা বলেন, ধর্মবিশ্বাস ও নৈতিকতার নাম ব্যবহার করে যে ধরনের ভুল তথ্য প্রচার করা হচ্ছে, তা সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি করছে এবং সাধারণ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করছে।

বিবৃতির প্রেক্ষাপট

শনিবার (২৯ নভেম্বর) প্রকাশিত এই বিবৃতিতে শিক্ষকরা উল্লেখ করেছেন, “বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ জনগণ সব সময়ই ভিন্ন মত, পথ ও সংস্কৃতির প্রতি সহনশীল। বাউল দর্শন ও ধর্ম আমাদের সাংস্কৃতিক বাস্তবতার অংশ। তবে, বাউল দর্শনের কিছু রীতি ও আচার এ দেশের মূল নৈতিক মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং দেহতত্ত্বনির্ভর অনুশীলন সমাজের জন্য বিপজ্জনক।”

শিক্ষকরা আরও বলেন, “ড. আনোয়ারুল করিম তার গ্রন্থ ‘বাংলাদেশের বাউল’-এ বাউল সম্প্রদায়ের কিছু বিশেষ আচার ও দেহতান্ত্রিক রীতির উল্লেখ করেছেন। যেমন: মাসিকের রক্ত, বীর্য, স্তনদুগ্ধ পান করা; গাঁজা সেবন; ‘প্রেমভাজা’ নামে অস্বাস্থ্যকর পদার্থ গ্রহণ; বিবাহবহির্ভূত যৌনাচার। এগুলো সাধারণ মানুষের নৈতিক মূল্যবোধের পরিপন্থি এবং সামাজিকভাবে ক্ষতিকর।”

আবুল সরকারের আচরণে উদ্বেগ

শিক্ষকরা মনে করেন, “বাউলদের নিজস্ব দর্শন ও আচার-অনুশীলন যতক্ষণ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করে না, ততক্ষণ তা গ্রহণযোগ্য। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বাউল আবুল সরকারের কর্মকাণ্ড এই সীমা অতিক্রম করেছে। তিনি একটি অনুষ্ঠানে কুরআনের আয়াত বিকৃতভাবে পাঠ করেছেন এবং আল্লাহর নামে মিথ্যা তথ্য পরিবেশন করেছেন, যা মুসলিমদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করেছে। এছাড়া বাউল দর্শনের শিরকী বক্তব্য তিনি ইসলামের মোড়কে উপস্থাপন করেছেন।”

তাদের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আবুল সরকারের বক্তব্য যেমন ছিল:

  • “আল্লাহর কথার গোয়া-মাথা আমি কিছুই পাই না।”
  • বাউল গানের মাধ্যমে তিনি ইসলামকে ছদ্মাবরণের আড়ালে সমাজে ভুল ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেছেন।

শিক্ষকরা বলছেন, “এই ধরনের শিরকপূর্ণ এবং অশ্লীল বক্তব্য সমাজে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। তার উসকানির কারণে সাধারণ জনগণ ক্ষুব্ধ হয়েছে। যদিও আইন নিজের হাতে নেওয়া সমর্থনযোগ্য নয়, তবে আবুল সরকারের উসকানিই মূল কারণ।”

শিক্ষকদের দাবি

বিবৃতিতে শিক্ষকরা রাষ্ট্র ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে দাবি জানান,

  1. আবুল সরকারের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ।
  2. ইসলামের মোড়কে বাউল দর্শন ও আচারের প্রতারণামূলক প্রচার বন্ধ করা।

শিক্ষকরা বলেন, “যিনি সমাজে উসকানি সৃষ্টি করেছেন, তার মুক্তি দাবি করা কোনো শিক্ষিত ও বিবেকবান মানুষের কাজ হতে পারে না। কিছু তথাকথিত বুদ্ধিজীবী বাক স্বাধীনতা ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার আড়ালে তার অপকর্মকে আড়াল করছেন, যা সাধারণ জনতার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে তুলতে পারে।”

বিবৃতিতে অংশগ্রহণকারী শিক্ষকেরা

এই যৌথ বিবৃতিতে মোট ৩৭১ জন শিক্ষক অংশ নিয়েছেন। এদের মধ্যে রয়েছে:

  • ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়: অধ্যাপক সাবিনা ইয়াসমিন (জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি), অধ্যাপক মনজুরুল মুহম্মদ করিম (মাইক্রোবায়োলজি)।
  • বুয়েট: অধ্যাপক মোহাম্মদ ফয়সল।
  • বুটেক্স: অধ্যাপক মাহমুদা আক্তার।
  • সিটি ইউনিভার্সিটি: প্রো-ভিসি অধ্যাপক কাজী শাহাদাৎ কবীর।
  • ডুয়েট: অধ্যাপক কাজী রফিকুল ইসলাম।
  • চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়: অধ্যাপক আয়েশা আখতার (মেরিন সায়েন্স), সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক (দর্শন)।
  • শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়: অধ্যাপক শামীমা তাসনীম (রাষ্ট্রবিজ্ঞান), অধ্যাপক মোহাম্মাদ আবুল হাসনাত (রসায়ন)।
  • রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়: অধ্যাপক তারেক মুহাম্মদ তওফিকুর রহমান (রাষ্ট্রবিজ্ঞান)।
  • জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়: অধ্যাপক তারেক মুহাম্মদ শামসুল আরেফিন (অর্থনীতি)।
  • ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি: অধ্যাপক মোখতার আহমাদ।
  • কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ: সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. আরিফ মোর্শেদ খান।
  • ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি (আইইউবি): সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মাদ সরোয়ার হোসেন।
  • মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি: লেকচারার আসিফ মাহতাব উৎস।

বিবৃতিতে ১০০ জন অধ্যাপক, ৭৪ জন সহযোগী অধ্যাপক, ৯৯ জন সহকারী অধ্যাপক এবং ৯৮ জন লেকচারার রয়েছেন। শিক্ষকদের সম্পূর্ণ তালিকা প্রকাশিত হয়েছে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে।

সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব

শিক্ষকরা সতর্ক করেছেন, “ধর্মের আড়ালে এমন প্রকারের প্রতারণামূলক প্রচার সমাজে বিভ্রান্তি, আঘাত ও অস্থিরতা সৃষ্টি করছে। এটি শুধুমাত্র ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ক্ষতিকর নয়, বরং সমাজের নৈতিক ও সামাজিক বন্ধনও বিপন্ন করছে।”

তাদের মতে, সাধারণ মানুষ ও শিক্ষিত সমাজের জন্য এমন পরিস্থিতি গ্রহণযোগ্য নয়। ধর্ম ও সংস্কৃতির প্রতি সম্মান বজায় রেখে সঠিক শিক্ষণ ও সচেতনতা নিশ্চিত করাই বর্তমানে প্রধান দায়িত্ব।

বাংলাদেশের ৩৭১ জন শিক্ষক স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, ইসলাম মোড়কে বাউল দর্শন ও আচারের প্রতারণা বন্ধ করতে হবে। তারা রাষ্ট্র ও আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার কাছে দাবি জানিয়েছেন, আইনশৃঙ্খলা বজায় রেখে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। একই সঙ্গে সমাজে বিভ্রান্তি ও অস্থিরতা সৃষ্টি থেকে বাঁচতে শিক্ষামূলক ও নৈতিক দিক থেকে সচেতনতা বৃদ্ধি করা অপরিহার্য।

শিক্ষকরা আশাপ্রকাশ করেছেন, সামাজিক শান্তি, নৈতিক মূল্যবোধ ও ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি সম্মান বজায় রেখে সকল ধর্মপ্রাণ নাগরিক যেন বিভ্রান্তি ও উসকানিমুক্ত জীবন যাপন করতে পারে, তা নিশ্চিত হবে।

MAH – 14041 I Signalbd.com

মন্তব্য করুন
Advertisement

Related Articles

Back to top button