সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কের গ্রামীণ এলাকায় আবারও ভয়াবহ হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। শুক্রবার ভোরে বেইত জিন ও মাযরাত বেইত জিনের মধ্যবর্তী অঞ্চলে ইসরাইলি বিমান ও ড্রোন হামলার কারণে নারী ও শিশু সহ কমপক্ষে ১৩ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে দুইজন নারী এবং দুইজন শিশু রয়েছে।
এই হামলার পরপরই কয়েক ডজন পরিবার বেইত জিন শহর থেকে নিকটবর্তী নিরাপদ এলাকায় পালাতে বাধ্য হয়। হামলার ফলে এই অঞ্চলে গভীর আতঙ্ক ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে।
হামলার বিস্তারিত ও তাজা পরিস্থিতি
সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ মাধ্যম আল-ইখবারিয়া জানিয়েছে, ভোরের দিকে শুরু হওয়া এই হামলার সময় ইসরাইলি বিমান ও ড্রোনগুলো লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। এতে নিহতদের পরিবারের মধ্যে ব্যাপক হতাশা ও শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
সিরিয়ান আরব নিউজ এজেন্সি (সানা) জানিয়েছে, দুই শিশুসহ কমপক্ষে পাঁচজন সিরিয়ানের মরদেহ কুনেইত্রার আল-সালাম শহরের গোলান জাতীয় হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। আহতদের উদ্ধার করতে গেলে বেইত জিনে প্রবেশ করতে পারেনি সিভিল ডিফেন্সের উদ্ধারকারী দল, কারণ হামলা চলাকালীন সময়েও ইসরাইলি ড্রোনগুলো এলাকার উপর দিয়ে উড়ছিল।
সিরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিন্দা
সিরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে এই হামলার কড়া নিন্দা জানিয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্য করে নৃশংস ও ইচ্ছাকৃতভাবে হামলা চালানো হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী যুদ্ধাপরাধের সামিল।”
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরও উল্লেখ করেছে, এই ধরনের হামলা শুধু মানুষের জীবন নয়, বরং সিরিয়ার সামগ্রিক স্থিতিশীলতাকেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
ইসরাইলের হামলার পটভূমি
সিরিয়ার সরকারি তথ্যে দেখা যায়, দখলদার ইসরাইলি বাহিনী ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে সিরিয়ায় ১ হাজারেরও বেশি বিমান হামলা চালিয়েছে। এছাড়া দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোতে ৪০০টিরও বেশি আন্তঃসীমান্ত হামলা চালানো হয়েছে। চলতি নভেম্বর মাসেই দক্ষিণ সিরিয়ায় ৪৭টি হামলা চালানো হয়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই ধরণের হামলা ইসরাইলের সিরিয়ার দক্ষিণ সীমান্তে নিজের আধিপত্য বজায় রাখার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা যায়। পাশাপাশি, তারা সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীকে সহায়তা করে এবং সিরিয়ার অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছে।
বেসামরিক নাগরিকদের ভয়াবহ ক্ষতি
হামলার ফলে যে নারীরা এবং শিশুরা নিহত হয়েছে, তাদের পরিবার এখন শোক এবং আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে। অনেক পরিবার নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। সিভিল ডিফেন্স কর্মীরা আহতদের উদ্ধার করতে চাইলেও ইসরাইলি ড্রোন হামলার কারণে তা সম্ভব হয়নি।
এক স্থানীয় বাসিন্দা সাংবাদিকদেরকে বলেন, “আমরা ভয় পাচ্ছি, আমাদের শিশুরা এখন নিরাপদ নয়। রাতের বেলা ঘুমাতেও পারি না। ইসরাইলি বিমান যে কোনও মুহূর্তে আবার হামলা চালাতে পারে।”
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
ইসরাইলি হামলার পর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা ইসরাইলকে বেসামরিক জনগণকে লক্ষ্য করে হামলা বন্ধ করার জন্য আহ্বান জানিয়েছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার অফিস থেকে বলা হয়েছে, “বেসামরিক নাগরিকদের উপর হামলা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন লঙ্ঘন করে। সিরিয়ার জনগণ শান্তি এবং নিরাপদ আশ্রয়ের অধিকার রাখে।”
সিরিয়ার দীর্ঘস্থায়ী সংকট
সিরিয়া দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক ও সামরিক সংকটে জর্জরিত। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোতে অব্যাহত সংঘাতের কারণে বেসামরিক মানুষের জীবন ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ইসরাইলি হামলার ফলে এই অঞ্চলের পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।
সিরিয়ার সরকার নিয়মিত আন্তর্জাতিক মহলকে এই সমস্যার দিকে সতর্ক করে আসছে। তারা বারবার বলেছেন, “বেসামরিক জনগণকে লক্ষ্য করে যে কোনও আক্রমণ আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন। এই হামলা সিরিয়ার শান্তি প্রক্রিয়াকে ধ্বংস করছে।”
স্থানীয়দের অবস্থা
হামলার পর বেইত জিন এলাকার স্কুল, হাসপাতাল ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক পরিবার এখন বেসামরিক আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছে।
স্থানীয় এক শিক্ষার্থী বলেন, “আমরা স্কুলে যেতে পারি না। প্রতিটি মুহূর্তে আতঙ্ক থাকে। আশা করি, আন্তর্জাতিক সমাজ আমাদের সাহায্য করবে।”
ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইসরাইলের হামলা অব্যাহত থাকলে সিরিয়ার দক্ষিণাঞ্চলের মানুষদের জীবন আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তা ছাড়া বেসামরিক জনগণ তাদের জীবন রক্ষা করতে পারবে না।
এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে দ্রুত হস্তক্ষেপ করতে হবে এবং সিরিয়ার বেসামরিক মানুষদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
MAH – 14039 I Signalbd.com



