একজন প্রবাসী বাংলাদেশি কুয়েতে অর্থগত তীব্র চাপ ও ঋণের বোঝা মস্তকে নিয়ে আত্মহত্যা করেছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। খবর পেয়ে বাংলাদেশ দূতাবাস ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ঘটনার প্রাথমিক তদন্ত শুরু করেছে। নিহত ব্যক্তির পরিবার বর্তমানে রাঙার আত্তীক শোকগ্রস্ত।
ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ
কুয়েতের মাহবুল্লাহ এলাকায় কর্মরত মো. তাজরুল মোল্লা (৩৮) নামে একজন বাংলাদেশি কর্মীর সোমবার সন্ধ্যায় নিজ কোম্পানির বাসভবনে তার জীবনের ইতি টেনেছেন, বলে স্থানীয় কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে। তাজরুল দীর্ঘ কয়েক বছর কুয়েটে নির্মাণ/পরিষেবাক্ষেত্রে কাজ করেছেন। খবর পেয়ে কোম্পানির কর্মকর্তারা ও স্থানীয় পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং বাংলাদেশ দূতাবাসকেও অবহিত করা হয়। দূতাবাস প্রাথমিকভাবে মৃতদেহ ও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করছে এবং প্রয়োজনীয় কনসুলার সহায়তা প্রদান করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
দূতাবাসের পদক্ষেপ ও স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা
ঘটনার পরে বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন এবং নিহতের পরিচয় ও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে বলে সূত্রে জানা গেছে। কুয়েতি কর্তৃপক্ষ প্রাথমিক তদন্তে ঘটনাটিকে আতœহত্যা হিসেবে তলব করেছেন এবং ঘটনার পিছনে অর্থনৈতিক সমস্যা ও চাপ সম্পর্কিত তথ্য যাচাই করছে। দূতাবাস নিহতের পরিবারকে মরদেহ হস্তান্তর এবং ক্যানসুলার সেবা প্রদানে সহায়তা করবে বলে জানিয়েছে।
প্রবাস জীবন, ঋণ ও মানসিক চাপ: পটভূমি
প্রায়শই বিদেশে কাজ করা প্রবাসীদের ওপর কাগজপত্র, ঋণ, পরিবারিক দায়িত্ব ও দুর্বল শ্রম ব্যবস্থাপনার কারণে প্রচণ্ড মানসিক চাপ থাকে। অনেকে উচ্চ প্রত্যাশা নিয়ে প্রবাস গমন করেন কিন্তু বাস্তবে আয় প্রত্যাশার তুলনায় কম হলে, বিদেশি ভিসা ও কাজের অনিশ্চয়তা, বদনামি প্রতারণা কিংবা বেতনহীনতার মতো কারণে ঋণের বোঝা বেড়ে যায়। এই ধরনের আর্থিক ও মানসিক চাপ অনেক ক্ষেত্রে কঠিন সিদ্ধান্তে পৌঁছে দেয়।
বিশেষত দালালচক্র বা অনৈতিক রিক্রুটারদের কারণে অতিরিক্ত ঋণ নিয়ে গিয়ে প্রবাসীরা সংকটে পড়ছেন—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিন থেকে মতান্তরে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সামাজিক সুরাহা ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা না থাকলে প্রবাসীরা মানসিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে পারেন।
পরিবার ও গ্রামবাসীর প্রতিক্রিয়া
নিহতের গ্রামের শুভানুভূতিবতীরা বলেন, তাজরুল পরিবারকে কয়েকবার টেলিফোনে মীরেছেন; তিনি দীর্ঘদিন থেকেই বাড়ি থেকে খরচ পাঠাতেন। সম্প্রতি পরিবারের কাছে তিনি আর্থিক চাপের কথা বলেছিলেন বলে পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন। শোকাহত পরিবার বাংলাদেশের দূতাবাসের সঙ্গে সমন্বয় করে মরদেহ ফেরত আনার বিষয় চেয়েছে এবং প্রাথমিকভাবে কনসুলার সহায়তা কামনা করেছে।
বিশ্লেষণ: কীভাবে এধরনের ঘটনা রোধ করা যায়
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রবাসীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে নিম্নলিখিত পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি:
- রিক্রুটিং প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ ও কড়াকড়ি করা, অনৈতিক দালালচক্রকে নির্মূল করা।
- প্রবাসীদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য সেবা ও হটলাইন চালু রাখা।
- রেমিট্যান্স, বেতন নিশ্চয়তা ও কাজের চুক্তি কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করা।
- প্রবাসী কর্মীদের প্রশিক্ষণ ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি।
সামাজিক সেবা প্রতিষ্ঠিত রাখলে এবং কনসুলার সেবা দ্রুতগতিতে প্রদানে উৎসাহ দিলে এ ধরনের দুর্ঘটনা অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
সরকার ও কনসুলার ভূমিকা
বাংলাদেশ সরকারের প্রবাসী কল্যাণ নীতি ও দূতাবাসগুলোকে প্রবাসীদের সুরক্ষায় আরও সক্রিয় রাখার দাবি উঠেছে। অনেকে মনে করেন, নিয়োগকর্তা ও মধ্যস্থতার নিয়ন্ত্রণ না হলে বিদেশে কাজরত শ্রমিকরা ঝুঁকির মধ্যে থাকবে। নিহতের ঘটনায় দূতাবাস যে দ্রুত হস্তক্ষেপ করেছে তা স্বস্তির, তবে দীর্ঘমেয়াদী নীতি ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাও তৎপরতায় আনার প্রয়োজন রয়েছে।
পরিশেষে
একজন প্রবাসীর জীবন ঋণের বোঝা ও মানসিক বিপর্যয়ের শিকার হয়ে শেষ হয়ে যাওয়ায় পরিবার ও সমাজের জন্য এটি শোকের বিষয়। এ ঘটনা প্রবাসী কর্মীদের বিপজ্জনক বাস্তবতার স্মরণ করিয়ে দেয়—অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, মূল্যবোধসম্মত নিয়োগপ্রক্রিয়া এবং মানসিক স্বাস্থ্য সেবার অভাব কতটা ভয়াবহ পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে পারে। দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, দূতাবাস ও সমাজকে একত্রে কাজ করে প্রবাসী কর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে দ্রুত প্রয়াস চালাতে হবে।
যদি আপনি বা আপনার পরিচিত কেউ মানসিক সংকট বা আত্মহত্যার ভাবনা নিয়ে ভুগছেন, অনুগ্রহ করে স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্র, সমাজসেবা বা নিকটস্থ সাহায্যকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।
এম আর এম – ১১৬৯, Signalbd.com



